শিক্ষক সংগঠন ও সরকারের উদ্দেশে সবিনয় নিবেদন

প্রশান্তি ডেক্স ॥ সারা বিশ্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কোটি কোটি শিক্ষার্থী যখন বাসগৃহে আবদ্ধ, তখন তাদের শিক্ষাজীবন কীভাবে সচল রাখা যায়, তা নিয়ে একের পর এক উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে। অনলাইনে পাঠদান, দূরশিক্ষণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে তথ্য পরিবেশন ইত্যাদি এ কর্মসূচির মধ্যে আছে। আমাদের দেশও পিছিয়ে নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে সংসদ অধিবেশন প্রচারকারী চ্যানেল গত ২৫ মার্চ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য ঘরে স্কুল কর্মসূচিতে ধারণকৃত পাঠদান পরিচালনা করছে। তবে টেলিভিশনে শিক্ষার্থীদের পাঠদান কর্মসূচিতে গুণগত টেকনিক্যাল মান ও শিক্ষার্থীরা তা কীভাবে গ্রহণ করছে, এসব নিয়ে আলোচনার অবকাশ আছে। এ কর্মসূচিতে শহরে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হলেও গ্রামাঞ্চলে ছাত্রছাত্রীরা তার সুফল কতটুকু পাবে, তা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন। অন্যদিকে শিক্ষাপঞ্জি যেভাবে ধাক্কা খেয়েছে, তাতে এবং জীবন-জীবিকার তাগিদে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হারও বেড়ে যেতে পারে। তবে আমি মনে করি, এখন এসব নিয়ে নেতিবাচক সমালোচনা পরিহার করে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে তাদের কিছুটা হলেও ব্যস্ত রাখার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানো দরকার। নিউইয়কের ফোর্টহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার শিক্ষক অধ্যাপক কামরুল হুদা কভিড মোকাবেলায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন— ১. প্রচলিত পাঠদান ব্যবস্থায় পরিবর্তন অনস্বীকার্য; ২. শিক্ষার্থীদের গভীর শিক্ষা চাহিদা পূরণে আমাদের মিলিত উদ্যোগে খুঁত বা ঘাটতি থাকলেও বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের তা মেনে নিতে হবে। ইউনেস্কো ব্যাংকক কেন্দ্র থেকে ই-মেইলে প্রায় প্রতিদিন আমাকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা উন্নয়নের কর্মসূচির তথ্য ও তথ্যচিত্র কয়েক বছর ধরে পাঠিয়ে আসছে। বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাসজনিত পরিস্থিতির মধ্যে শিক্ষার্থীরা কীভাবে বাসার মধ্যে লেখাপড়া করছে, তার ওপর আকর্ষণীয় সচিত্র বর্ণনাসংবলিত, কোনো কোনোটা ভিডিও হিসেবে ধারণকৃত বিষয় ও শিক্ষক-অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া পরিবেশন করছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থী যে স্কুলে পড়ে, অনলাইনে সে স্কুলের পাঠদান কর্মসূচি ও বিভিন্ন শিক্ষা উন্নয়ন একাডেমি বা প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ধরনের কর্মসূচি। টেকসাসের কলিভিলে অবস্থানরত সপ্তম শ্রেণীর আমার দ্বিতীয় পৌত্র ইশান কাজীর মতে, বাসায় বসে তাকে ক্লাস করতে হচ্ছে, তা বোরিং হলেও দরকারি। পৃথিবীর দেড় শতাধিক দেশে শিক্ষক সংগঠন নিয়ে গঠিত এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল বা ইআই শিক্ষকদের করণীয় ও তাদের জন্য করণীয় নিয়ে কয়েক দিন আগে নির্দেশনা প্রচার করেছে। সেখানে শিক্ষার সঙ্গে বিশ্বব্যাপী করোনার আগ্রাসন মোকাবেলায় শিক্ষক ও তাদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের সম্ভাব্য কার্যকলাপের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। বৈশ্বিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সহায়ক নানা কর্মসূচি নিয়েছে। কয়েকটি জেলায় নারী শিক্ষকদের সৃজনধর্মী উদ্যোগের খবর, যেমন মাস্ক তৈরি করে পরিবেশন এবং দুস্থদের খাবার সরবরাহের মতো সংবাদ জানা গেছে। শিক্ষক সংগঠনের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষকদের সংগঠনের আঞ্চলিক শাখার সদস্যরা মাস্ক, খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করছেন। বরিশাল ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এরই মধ্যে জানিয়েছে যে শিক্ষকরা তাদের একদিনের বেতন জাতীয় ত্রাণ তহবিলে দেবেন। তবে জাতীয় পর্যায়ে মূলধারার শিক্ষক সংগঠনের কর্মসূচি এখন পযন্ত আমার খুব একটা চোখে পড়েনি। শিক্ষক সংগঠনগুলো অতীতে শিক্ষকদের কল্যাণে জাতীয় দুর্যোগে দায়িত্ব পালন করেছে। আশা করি, এবারো তার ব্যতিক্রম হবে না। এক্ষেত্রে দুটি বিষয় লক্ষ রাখা দরকার। শিক্ষকদের মধ্যে যারা ন্যূনতম আর্থিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত, যেমন এমপিও, তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার। এমপিওভুক্তরা এমপিওবঞ্চিত শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারেন। অর্থাত্ তাদের নিজেদের বেতন থেকে তাদের সহায়তা দিতে পারেন। সেই সঙ্গে জাতীয় ত্রাণ তহবিলে ন্যূনপক্ষে একদিনের বেতন প্রদানে এগিয়ে আসতে পারেন। শ্রেণীকক্ষে না থেকেও শিক্ষকরা কীভাবে শিক্ষার্থীদের পড়াতে পারেন, গুগল তার জন্য ১০ মিলিয়ন ডলারের স্কুলশিক্ষণ তহবিল গঠন করেছে। টিচ ফ্রম হোম ও গুগল ফর এডুকেশন শ্রেণীকক্ষের বাইরে থাকা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও পাঠগ্রহণ অব্যাহত রাখতে ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর ইনফরমেশন টেকনোলজি ইন এডুকেশনের সমর্থন ও সহায়তায় এ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। অন্যদিকে করোনা মহামারীর মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে গত ২৫ মাচের পর ইআই বিভিন্ন দেশের সরকারের উদ্দেশে যে ১২ দফা সুপারিশ দিয়েছে, তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ হলো বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাকালে শিক্ষার্থীদের পাঠদান অব্যাহত রাখতে সরকারের উচিত শিক্ষক ও তাদের সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে কর্মসূচি গ্রহণ। বিশেষ করে পেডাগোজি, ডিজিটাল উপকরণ ও প্লাটফর্ম বা মাধ্যম নির্ধারণে তাদের যুক্ত করা। বাংলাদেশের শিক্ষকদের একদিনের বেতন কর্তনসংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই শিক্ষক সংগঠনগুলোর উচিত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেয়া। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ঘরে বসে লেখাপড়া করানোর কর্মসূচিতে শিক্ষক সংগঠনগুলোকে যুক্ত করার প্রস্তাবও শিক্ষক সংগঠনগুলোর দিক থেকে সরকারের কাছে দেয়া দরকার। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষক সংগঠন ও সরকারের কাছে আমার এ সবিনয় নিবেদন। লেখক: অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর অন্যতম প্রণেতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.