প্রশান্তি ডেক্স॥ করোনাভাইরাসে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ২১ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ালো ৫০১ জনে। একদিনে নতুন করে আরো ১ হাজার ৯৭৫ জন করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। ৮ মার্চ বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ার পর একদিনে এত বেশি রোগী আর কোনোদিন শনাক্ত হয়নি। দেশের মোট জনসংখ্যা অনুপাতে মৃত ৫০১ সংখ্যাটি হয়তো শতকরা হিসেবে শুন্য দশমিকের পরে অনেকগুলো শুন্যের নিচে চাপা পড়বে যা হিসেবে আসবার মতন কোন সংখ্যাই নয়। কিন্তু, যে পরিবারের ১ জন এই মৃতের সংখ্যার মধ্যে পড়েছেন, সেই পরিবার জানে সংখ্যাটি তাদের জন্য কতটা ভারী। যতই বয়স হোক বা বয়সের কারনে করোনার সাথে যুদ্ধ করে তারা মারা যান না কেন, স্বজনের কাছে তো হত্যাকারী হিসেবে করোনাই দোষী সাব্যস্ত হবে। যখন একটি পরিবারের কথা আমরা চিন্তা করবো, হোক সে আমার নিজের পরিবার বা অন্য কারো, করোনায় মৃত্যু আমাদের কে আতংকে ফেলছে। সামান্য ৫০১ সংখ্যাটি আমাদের বুকের উপর পাহাড়ের ওজন নিয়ে চেপে বসেছে।

যখন রাষ্ট্র তার অবস্থান থেকে দেখবে এবং ভাববে, তখন সেখানে আমাদের ৫০১ টি পরিবারের বাইরে বিশাল সংখ্যা তার সামনে আসে। দেশের অর্থনীতি, মানুষের ক্ষুধার্ত চেহারা রাস্ট্রকে বিচলিত করে। তখন রাষ্ট্রকে এই ৫০১ সংখ্যাটা মোট জনসংখ্যার অনুপাতের হিসেবে ফেলে দেখতে হয় বৈকি। তর্কের খাতিরে অনেকেই বলেন এই করোনায় আক্রান্তে মৃতের চেয়ে দেশে সারাজীবন সড়ক দূর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা অনেক গুন বেশি ছিলো। তাদের কে বিনয়ের সাথে অনুরোধ করবো, এমন নাজায়েজ তুলনা না করতে। এই মূহুর্তে সরকার দেশের সাধারণ ছুটি যা অঘোষিত লকডাউন বলে আমরা দেখেছি, তা আর বাড়াচ্ছেন না। অর্থাৎ রাষ্ট্র মনে করছে দেশে করোনার আক্রমণে মৃত্যু হার অতটা ভয়ংকর জায়গায় এখন পর্যন্ত পৌছায়নি যতটা ভয়ংকর পর্যায়ে পৌছেছে দেশের অর্থনীতি। আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি এসে দাড়াবে আনুমানিক ১৩০০ কোটি ডলার বা ১ লক্ষ্য কোটি টাকার উপরে।
বিশ্বব্যাংক আশংকা করছে আমাদের জিডিপি নেমে আসতে পারে ৩ শতাংশে এবং প্রতিবেশী রাস্ট্র ভারতের জিডিপি নামতে পারে ৪.৮ শতাংশে। যদিও এ নিয়ে বিতর্ক চলছে, তবুও এটা নিশ্চিত যে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে। এমন অবস্থায় একটু রিস্ক নিয়ে হলেও অর্থনীতির চাকা সচল করতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া সরকারের তেমন কোন বিকল্প পথ খোলা নেই। করোনা দুর্ভোগের চেয়ে অনাহার ও দূর্ভিক্ষের দুর্ভোগটা অনেক গুন বেশি ভয়াবহ হবে তা নিশ্চিয়ই বলে বোঝাবার প্রয়োজন নেই। সমস্ত দেশ জুড়ে লুটতরাজ এবং হানাহানি মারামারিতে লাখ লাখ মানুষের প্রানহানীর আগাম সম্ভাবনা সরকারকে মাথায় নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে, সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
করোনার শুরুর দিকে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় যে খামখেয়ালীপনা করেছে, বিপদটা গায়ে মাখেনি একথা যেমন সত্য, তেমনি অনেক উন্নত দেশও এই দূর্যোগকে সফলভাবে মোকাবেলা করতে পারেনি তাও মনে রাখা প্রয়োজন। আজ পর্যন্ত দেশে পরিক্ষা করে করোনা রোগী মিলেছে ৩৫ হাজার ৫৮৫ জন, হয়তো পরিক্ষার বাইরে রয়ে গেছে একটি বিশাল সংখ্যার মানুষ এই সত্যটাও আমাদের মনে রাখতে হবে। সেই হিসেবে আক্রান্ত অনেক বেশি এবং মৃতের হার আরও অনেক কম বলে ধরে নিতে হবে।
এখন প্রশ্নে হচ্ছে এই মুহূর্তে করণীয় কী? প্রথমেই বলে রাখি, সরকারের সাধারণ ছুটি যেভাবে পালিত হয়েছে, তা চরম ঢিলেঢালা লকডাউন বলেই আমি মনে করি। এই লকডাউন যেমন আমাদের অনেক কে টানা দুই মাস ঘরবন্দী করে রেখেছে, আবার বেশিরভাগ মানুষই থেকেছে ঘরের বাইরে। তাই ফলাফল যেই লাউ সেই কদু। মাঝে দেশের লাখ কোটি টাকার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত। এখন সময় এসেছে, এই অবস্থা থেকে ফিরে আসতেই হবে।
প্রথমত, হট স্পট বাদে সমগ্র বাংলাদেশকে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসতে হবে। যতটুকু স্বাস্থ্যবিধি না মানলেই নয় ততটুকু মানতে বাধ্য করাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের করোনা সংক্রমনের হট স্পটগুলোতে কারফিউ জারি করে হলেও লকডাউন মানতে বাধ্য করতে হবে অন্তত আরও এক মাস। এই সময়ের মধ্যে সেসব এলাকা থেকে কেউ যেমন বের হতে পারবেনা, তেমনি কাওকে ঢুকতেও দেওয়া যাবেনা। এসব এলাকার বাসিন্দাদের প্রয়োজনীয় সবকিছু তাদের বাসায় পৌছে দিতে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। পুলিশ এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে তাদের কে এসব সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
যদি কোন কারণে করোনা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মৃত্যুহার আশংকাজনকহারে বেড়ে যায়, তবে দ্রুততম সময়ে সমস্ত দেশ জুড়ে কারফিউ ঘোষনা করে করোনা নিয়ন্ত্রনের শেষ চেষ্টা টা করতে হবে। তবে এই কারফিউ হওয়া উচিত সরকারের চূড়ান্ত পদক্ষেপ, যা দেশের করোনা মৃত্যুহার বিবেচনায় রেখে তারা নিতে পারেন। যেহেতু করোনা রোগীদের চিকিতসায় বেশ কিছু ফলপ্রসূ পদ্ধতি ও ঔষধ ইতিমধ্যেই সফলতার প্রমাণ রেখেছে, তাই করোনাকে অতটা ভয় করবার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করিনা।
অনেকে হয়তো ব্রাজিলে করোনার ভয়াবহতা উদাহারণ হিসেবে উল্লেখ করবেন, তাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, ব্রাজিলে করোনার মৃত্যুহার প্রথম থেকেই অনেক বেশি। সেখানকার করোনাভাইরাসের শক্তি এবং ধরণ বাংলাদেশের চেয়ে ভীষণ আলাদা। অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রে আক্রমণ করা করোনার সাথে ব্রাজিলের মিল রয়েছে। আর তাই এই দুই দেশের মৃত্যুর সংখ্যা অনেকটাই কাছাকাছি। নিম্নে উল্লেখিত রিপোর্ট বলছে-
ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের একদল গবেষক ব্রাজিলকে সতর্ক করে জানিয়েছে, এখনই আরও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে আসছে আগস্টের শুরুতেই ব্রাজিলে কোভিড-১৯ সংক্রমণে মৃত্যু ১ লাখ ২৫ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। যেখানে করোনায় ব্রাজিলের বর্তমান মৃত্যু সংখ্যা সাড়ে ২৪ হাজারের বেশি। তাই আগস্টে যদি ওপরের সংখ্যা ছুঁয়ে ফেলে তবে তা পাঁচগুণ বেড়ে দাঁড়াবে। গবেষণা দলে কাজ করা ড. ক্রিস্টোফার মারে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ব্রাজিলকে উহান, চীনের পাশাপাশি ইতালি, স্পেন এবং নিউ ইয়র্কের নেতৃত্ব অনুসরণ করতে হবে ও দ্রুত গতিতে চলমান মহামারি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে আইন প্রয়োগ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
ব্রাজিলের ওপর এমন ভবিষ্যদ্বাণী করা হলো, কেননা দেশটির প্রতিদিনের মৃত্যুর হার যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দিনের মৃত্যুর হার-কে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সোমবার লাতিন আমেরিকার সর্ববৃহৎ দেশটিতে করোনা মারা গেছে ৮০৭ জন। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ৬২০।
বিশ্বের সব দেশ যেমন একরকম না, মানুষ ও তাদের অভ্যেস একরকম না, তাই উদাহারণের ক্ষেত্রেও সব দেশ আদর্শ উদাহারণ হতে পারেনা। আসুন আরেকবার সাহস নিয়ে যুদ্ধটাতে নেমে পড়ি, দেশের অর্থনীতি সচল হলে করোনা মোকাবেলা খুব কস্টসাধ্য কিছু হবেনা। একটি প্রবাদ আছে ‘পেটে খেলে পিঠে সয়’।
লেখক: সমাজকর্মী