দাবি আর আন্দোলনে বছর পার, ফলাফল কী হলো

প্রশান্তি ডেক্স ॥ বিগত বছরের শেষ মাস পর্যন্ত শিক্ষকদের দাবি-দাওয়ার আন্দোলন অব্যাহত ছিল। বিভিন্ন স্তরের এই আন্দোলনে বেশ কিছু প্রাপ্তি যোগ হয়েছে শিক্ষকদের ভাগ্যে। তবে বঞ্চিত রয়ে গেছেন অনার্স স্তরের শিক্ষকরা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস মিলেছে সরকারের পক্ষ থেকে। সব মিলিয়ে বছর শেষ হয়ে গেলেও শিক্ষকদের দাবি শেষ হয়নি। দাবি আদায় না হওয়া শিক্ষকরা নতুন বছরেও আন্দোলনে যাওয়ার আভাস দিয়েছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম স্থগিত) সরকার পতনের পর ৮ আগস্ট অন্তবর্তী সরকার গঠনের পর থেকে বিভিন্ন পেশাজীবীরা দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনে নামেন। অন্তবর্তী সরকার বেশকিছু দাবি মেনে নিলেও বেশিরভাগ দাবি রয়ে গেছে আশ্বাসে অথবা আশ্বাস ছাড়াই। ২০২৫ সালের পুরোটা সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অরাজকতার চিত্র দেখা গেছে। শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের আন্দোলন চলে বছরজুড়ে। তবে শিক্ষকদের দাবি গুরুত্ব পায় নানা কারণে।

শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষকদের দাবি যৌক্তিক। অপরদিকে অন্তবর্তী সরকারের পক্ষেও এই দাবি মেনে নেওয়া কঠিন। শিক্ষকদের দাবির ন্যূনতম হলেও মেনে নিতে হবে। অন্যথায়, ভবিষ্যতেও আন্দোলন কর্মসূচি চলবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন।  

শিক্ষক আন্দোলনের যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন কলেজের অধ্যক্ষ এবং বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘বছরজুড়ে আন্দোলন করার কারণে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হয়েছে। তবে সরকার চাইলে এই আন্দোলন দীর্ঘ হতো না। শিক্ষকদের দাবি যৌক্তিক। আন্দোলন শুধু এই সরকারের সময় করছে তা নয়, বিগত সময়েও আন্দোলন করেছেন শিক্ষকরা। সামনের দিনে যে সরকার আসবে, সেই সরকারের সময় আন্দোলন হবে। সরকারের উচিত শিক্ষকদের সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে চিহ্নিত করে তা দ্রুত সমাধান করা। শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে হলে শিক্ষক ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো না হওয়া পর্যন্ত এই সংকট থেকেই যাবে। তাই রাষ্ট্রকে এ বিষয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।’

প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের আন্দোলন : ১১তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ ও পদোন্নতি নিয়ে জটিলতা নিরসনের দাবিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা গত ১৭ অক্টোবর থেকে ‘আমরণ অনশন’ ঘোষণা দেন। সরকারের আশ্বাসে কর্মসূচি স্থগিতও করেন শিক্ষকরা। তবে সরকারের আশ্বাসের প্রতিফলন না পেয়ে সহকারী শিক্ষকরা দশম গ্রেডসহ তিন দফা দাবি আদায়ে গত ৮ নভেম্বর ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। পরদিন ৯ নভেম্বর পুলিশি নির্যাতনের পর অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রেখে লাগাতার কর্মবিরতির ঘোষণা দেয় শিক্ষক সংগঠনগুলো। ১০ নভেম্বর সরকারের আশ্বাসে আবার কর্মবিরতি স্থগিত করে। নভেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়ে আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত করলেও নভেম্বরের শেষ নাগাদ দাবির বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় ৩০ নভেম্বর থেকে আবার আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেন সহকারী শিক্ষকরা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আন্দোলন অবস্থান কর্মসূচি ও কর্মবিরতি  স্থগিতের পর দাবি আদায়ে গত ২ ডিসেম্বর নতুন করে কর্মসূচি ঘোষণা করেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা। গত ৩ ডিসেম্বর থেকে পরীক্ষা বর্জনসহ লাগাতার কর্মবিরতি ও বার্ষিক পরীক্ষা বর্জনের পর তিন দফা দাবি বাস্তবায়নে তারা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। গত ৭ ডিসেম্বর থেকে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলেও পরে পরীক্ষা নেওয়ার জন্য আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা দেন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ১১তম গ্রেডে সহকারী শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণে নতুন পে-কমিশন ও অর্থবিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের কর্মসূচি স্থগিত করে ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানায়।

প্রধান শিক্ষকদের আন্দোলন : সহকারী শিক্ষকদের পাশাপাশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা গত বছর আন্দোলন করেন। তাদের দাবি ছিল দশম গ্রেডে বেতন নির্ধারণসহ চার দফা। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড, ২০১৪ সালের ৯ মার্চ থেকে সব প্রধান শিক্ষকের দশম গ্রেডের জিও জারি, চলতি দায়িত্বসহ সিনিয়র শিক্ষকদের শতভাগ পদোন্নতি এবং ১০ বছর ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড। প্রধান শিক্ষকদের দাবির মধ্যে দশম গ্রেড নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। আন্দোলন স্থগিত করে ঘরে ফেরেন প্রধান শিক্ষকরা।

জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের (ডিপিই) মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে। সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও শিগগিরই ইতিবাচক অগ্রগতি প্রত্যাশা করা হচ্ছে।’

প্রাথমিক শিক্ষক আন্দোলনে পুলিশি নির্যাতন : শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কর্মসূচি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পুলিশের লাঠিচার্জ, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড হামলার শিকার হন। আহত হন ১০৯ জন শিক্ষক। পুলিশ আটক করে পাঁচজন শিক্ষককে। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদ জানিয়ে শিক্ষকরা শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি থেকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো.জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের পদত্যাগ দাবি করেন।

যে কারণে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের আন্দোলন : পিটিআই (প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট) সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা দশম গ্রেডে বেতন পান। একই পেশার একই পদে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা ১৩তম গ্রেডে বেতন পান।

শিক্ষকরা জানান, একই সমমানের শিক্ষক হওয়ার পরও তারা পান দশম গ্রেড আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পান ১৩তম গ্রেড। এই বৈষম্যের কারণেই দীর্ঘদিন থেকে দশম গ্রেড দাবি করছেন তারা। এছাড়া পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর, নার্স, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদ সচিব, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা দশম গ্রেডে বেতন-ভাতা পান। সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা দীর্ঘদিন লড়াই করেও ১১তম গ্রেড পাননি আন্দোলনকারী শিক্ষকরা।

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. আবুল কাসেম বলেন, ‘প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকদের প্রথম শ্রেণি (নবম গ্রেড) এবং সহকারী শিক্ষকদের জন্য দ্বিতীয় শ্রেণি (দশম গ্রেড) দাবি করে আন্দোলন করেছি। শিক্ষকদের যেমন সম্মান প্রয়োজন, তেমনি সংসার চালানোর মতো অর্থও দরকার।’

সহকারী শিক্ষকদের আন্দোলন প্রসঙ্গে মো. আবুল কাসেম বলেন, ‘একজন সহকারী শিক্ষক প্রবেশকালে সর্বমোট বেতন পান ১৭ হাজারের মতো। এই অর্থ দিয়ে ঢাকা শহর কেন, মফস্বল শহরেও চলবে না। আর প্রধান শিক্ষকরা প্রবেশকালে বেতন পান ১৯ হাজার টাকার মতো। অথচ পাঠদান ছাড়াও শিক্ষকদের সরকারের বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকতে হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘সর্বোচ্চ যোগ্যতা নিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করে যদি সংসার চালাতে কষ্ট হয়, সম্মান নিয়ে সমাজে চলতে সমস্যা তৈরি হয়, তাহলে মানসম্মত টেকসই শিক্ষা আশা করা যায় না। শিক্ষকদের অসন্তোষ নিশ্চয় তারা বুঝবেন যাতে আমাদের আন্দোলন করতে না হয়।’

বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. শামছুদ্দিন মাসুদ এবং বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির (শাহিন-লিপি) সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি শিক্ষকদের দাবি যৌক্তিক বলে উল্লেখ করেন।

খায়রুন নাহার লিপি বলেন, ‘পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর, নার্স, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদ সচিব, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা দশম গ্রেডে বেতন-ভাতা পান। সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা দীর্ঘদিন লড়াই করেও ১১তম গ্রেড পায়নি। তাই এখন দশম গ্রেড নির্ধারণসহ তিন দফা দাবি আদায়ে মাঠে নেমেছিলেন শিক্ষকরা।’

উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসারদের আন্দোলন : সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বা সহকারী শিক্ষকরাই নন, উপজেলা শিক্ষা অফিসাররাও তাদের দাবি আদায়ে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেছেন। তবে দাবি আদায়ের কর্মসূচি পালন করেই কাজে ফিরেছেন শিক্ষা কর্মকর্তারা।

আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষকদের শাস্তিমূলক বদলি : আন্দোলন কর্মসূচিতে শিক্ষক জোট ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’-এর পূর্ব নির্ধারিত অবস্থান কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির (কাসেম-শাহীন) সভাপতি প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কাসেম, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির (শাহিন-লিপি) সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি, বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. শামছুদ্দিন মাসুদ, দশম গ্রেড বাস্তবায়ন সমন্বয়ক মু. মাহবুবুর রহমান। এই শিক্ষকদের শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। মোট ৪৪ জন শিক্ষককে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বদলি করা হয়। এসব শিক্ষক নেতাসহ নোয়াখালীর জেলার সব শিক্ষককে শোকজ করা হয় আন্দোলন কর্মসূচির জন্য।

অনার্স শিক্ষকদের আন্দোলন : গত বছরের শুরুতে আন্দোলন কর্মসূচিতে রাজপথে নামেন দেশের এমপিওভুক্ত বেসরকারি ৩১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনার্স-মাস্টার্স স্তরের শিক্ষকরা। ৩২ বছর ধরে বিনা বেতনে চাকরি করা এসব শিক্ষক নতুন করে আন্দোলন শুরু করেন গত বছরের ১৫ থেকে ১৭ অক্টোবর। শিক্ষা ভবনের সামনে টানা তিন দিন আন্দোলন করেন বেসরকারি কলেজের অনার্স-মাস্টার্স স্তরের এই শিক্ষকরা। আন্দোলনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন লাঠিচার্জ, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে শিক্ষকদের আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। আহত হন বেশ কয়েকজন শিক্ষক, যাদের মধ্যে শিশুসন্তানসহ নারী শিক্ষকও ছিলেন।

পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ) ২০১৮ সালের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা সংশোধন করে শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। তবে নীতিমালা সংশোধন হয়নি গত এক বছরেও।

বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স ফেডারেশনের সভাপতি নেকবর হোসেন আন্দোলনের পর বলেন, ‘আন্দোলনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত হয়, সে কারণে আন্দোলন থেকে সরে এসেছিলাম। আমরা চাই দ্রুত জনবল ও এমপিও নীতিমালা সংশোধন করে এমপিওভুক্তির ব্যবস্থা নিক।’

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়িভাড়া বাড়ানোর আন্দোলন : মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৫০০ টাকা করা এবং উৎসব ভাতা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ করার দাবিতে আন্দোলন করেন এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকরা-কর্মচারীরা। আন্দোলনের ১০ দিনের মাথায় অর্থ বিভাগ নতুন করে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির সম্মতি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে। এরপর শিক্ষকরা তাদের আন্দোলন স্থগিত করেন।

শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম ২০ শতাংশ বাড়িভাড়া। নভেম্বর থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ এবং আগামী বছর থেকে সাড়ে সাত শতাংশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অনেক আলাপ আলোচনা করে তা করা হয়েছে। এরপর আমরা আন্দোলন থেকে ক্লাসে ফিরেছি।’

ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষকদের লাগাতার আন্দোলন : ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষা কার্যক্রম জাতীয়করণের দাবিতে গত ১২ অক্টোবর থেকে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষকরা। তারা গত ৩০ অক্টোবর বিকালের মধ্যে এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশের আল্টিমেটাম দেন এবং ২ নভেম্বর প্রেসক্লাব থেকে যমুনা অভিমুখে লংমার্চের ঘোষণা দেন। গত ২৯ অক্টোবর সচিবালয় অভিমুখে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় আন্দোলনরত শিক্ষকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ সময় সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও জলকামান নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। এতে আহত হন অর্ধশতাধিক শিক্ষক, যাদের অনেকেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ওই সময় চিকিৎসা নেন।

স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি শিক্ষক ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান কাজী মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘অনুদান পাওয়া শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত এবং নন-এমপিও ইবতেদায়ি শিক্ষকদের অনুদানের সিদ্ধান্তের পর তারা আন্দোলন শুরু করেন গত ১০ নভেম্বর। অনুদানভুক্ত এক হাজার ৫১৯টি প্রতিষ্ঠানের জন্য এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে চিঠি ইস্যু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আর নন-এমপিও ইবতেদায়ি শিক্ষকদের অনুদানভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শিক্ষকরা এমপিওভুক্তির জন্য জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে টানা ৪২ দিন আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেন। শিক্ষকরা জানান, আন্দোলনের কারণে দেড় মাসের বেশি মাদ্রাসায় শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকে।

প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলন : সব বিশেষ (অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী) বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তি সুনিশ্চিত করাসহ পাঁচ দাবিতে আন্দোলন করছেন প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। প্রায় একমাস আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়েও দাবি আদায় হয়নি এই শিক্ষকদের।

তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সব বিশেষ বিদ্যালয়ের প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো সুনিশ্চিত করতে হবে; বিশেষ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপবৃত্তি তিন হাজার টাকা নিশ্চিত করতে হবে; শিক্ষার্থীদের মিড-ডে মিলসহ উচ্চ উপকরণ দিতে হবে। এছাড়া খেলাধুলা সরঞ্জাম দেওয়া ও থেরাপি সেন্টার বাস্তবায়ন করতে হবে; ছাত্র-ছাত্রীদের ভোকেশনাল শিক্ষা কারিকুলামের আওতায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পুনর্বাসন সুনিশ্চিত করতে হবে এবং সব চাকরি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নির্ধারিত কোটা সুনিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় সমন্বয় পরিষদের সভাপতি মো. ইলিয়াস রাজ, মুখ্য সমন্বয়ক গাউসুল আজম শীমু, সাধারণ সম্পাদক রিমা খাতুন, সমন্বয়ক এম এ সালাম, মো. আসাদুজ্জামান, অ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসাইন এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শিক্ষক নেতারা জানিয়েছেন তাদের দাবি যৌক্তিক। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে আন্তরিক নয়।

শিক্ষক নিবন্ধন পাওয়া প্রার্থীদের আন্দোলন : বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন পাওয়া শিক্ষকরা বছরজুড়েই আন্দোলন করে আসছেন। গত ৯ নভেম্বর অবস্থান কর্মসূচি শেষে যমুনা অভিমুখে লংমার্চ করার কথা ছিল তাদের। কিন্তু সোমবার (১০ নভেম্বর) নিয়োগ বঞ্চিতদের সমস্যা প্রধান উপদেষ্টার কাছে পৌঁছানো হবে এ আশ্বাসে লংমার্চ কর্মসূচি স্থগিত করেন তারা।

নিবন্ধিত শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘ ২০০ দিনের আন্দোলনের পরও বিভিন্ন সময় প্রশাসনের আশ্বাস পেয়েছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিয়োগ পাননি। জাল সনদধারীরা নিয়োগ পেয়েছে, অথচ বৈধ সনদধারীরা এখনও বঞ্চিত। এই প্রার্থীদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা নেই বলে বারবার জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়। যদিও তা মানতে নারাজ নিবন্ধন পাওয়া প্রার্থীরা।

ছাত্রদের আন্দোলন : সবচেয়ে বেশি যে আন্দোলন মানুষের ভোগান্তি সৃষ্টি করে তা হচ্ছে ছাত্রদের আন্দোলন। যেকোনও ছোটখাটো বিষয়ে ছাত্রদের আন্দোলন করতে দেখা গেছে বছরজুড়ে। ঢাকা কলেজ, ঢাকা সিটি কলেজ এবং আইডিয়াল কলেজের ছাত্রদের আন্দোলন ছিল চেখে পড়ার মতো।

অন্তবর্তী সরকারের সময় সাত কলেজের আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, সরকারি বাংলা কলেজ ও তিতুমীর কলেজ ছাত্ররা স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় দাবি করেন। পরে সরকারি তিতুমীর কলেজ ছাত্ররা কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবি জানান।

অন্তবর্তী সরকার শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে সাত কলেজ নিয়ে একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়। অধ্যাদেশ চূড়ান্ত না হতেই সাত কলেজের ছাত্ররা কলেজের স্বাতন্ত্র বজায় রাখার আন্দোলন শুরু করেন। আরো কতোকিই না হয়েছে। শুধূ আন্দোলন আর আন্দোলন তবে কেউ কেউ আন্দোলন করে সফল হয়েছে আর কেউ কেউ আন্দোলন করে সবই খুইয়েছে। এরই ধারাবাহিকতা এইসকল আন্দোলন শেষ না হতেই ২০২৫ সাল শেষ  হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.