প্রশান্তি ডেক্স ॥ প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বছরে শুরু হবে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি। আগামী জানুয়ারি থেকে সারা দেশের এক লাখ ১৮ হাজার ৬০৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুই কোটি ৫ লাখ শিক্ষার্থী নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির আওতায় আসবে। এতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা যুক্ত করা হয়েছে। আর তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমানো হয়েছে এবং সব বিষয়ে রাখা হয়েছে মৌখিক বা ব্যবহারিক পরীক্ষা।

সম্প্রতি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য নতুন মূল্যায়ন নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এই মূল্যায়ন নির্দেশিকা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে শুরু হয়েছে অসন্তোষ। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ-অস্থিরতা বাড়বে, আর পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হবে শিশু শিক্ষার্থীদের মধ্যে। এছাড়া নতুন এই মূল্যায়ন পদ্ধতির জন্য শিক্ষার্থীদের কোচিং-নির্ভরতা বাড়বে। শিক্ষার্থীদের নতুন করে পরীক্ষার জন্য মানসিক চাপও তৈরি হবে।
নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে পাঠদানের ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচন ও রোজার কারণে দুই মাস পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এরই মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাথমিকের নতুন পদ্ধতি চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক চাপ এবং অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াবে।
নাম প্রকাশে একজন অভিভাবক সরকারের সিদ্ধান্তকে হঠকারী উল্লেখ করে বলেন, ‘শিক্ষকদের হাতে বেশি নম্বর রাখা হলে পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হবেই। তাছাড়া শিশুদের পরীক্ষা ও মৌখিক বা ব্যবহারিক পরীক্ষা নিয়ে চাপ তৈরি করা ছাড়া কিছুই নয়। বেশি নম্বর পাওয়ার জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে বাধ্য হবেন অভিভাবকরা।’
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি মাত্র ১০ মাসের জন্য চালু থাকবে। কারণ, ২০২৭ সালে প্রাথমিকে নতুন কারিকুলাম ও মূল্যায়ন চালু হবে। তাই ২০২৬ সালে নতুন করে মূল্যায়ন চালু করার সিদ্ধান্ত হঠকারী হবে। ১০ মাসের শিক্ষাক্রম মূল্যায়ন করতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ করাতে হবে। আবার ২০২৭ সালের নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হবে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে না নেওয়া উচিত।
নতুন এই পদ্ধতিতে দেখা যাচ্ছে, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে আগে শ্রেণি কার্যক্রম থাকলেও ২০২৬ সালে সামষ্টিক মূল্যায়নে (লিখিত পরীক্ষা) যুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে শ্রেণি মূল্যায়ন ও সামষ্টিক মূল্যায়নের সঙ্গে নতুন করে ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা যুক্ত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন এই মূল্যায়ন প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করতে শিক্ষকদের ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য তিন-চার মাস সময় প্রয়োজন হবে। আর জাতীয় নির্বাচন ও রোজার জন্য দুই মাস বন্ধ থাকবে। অর্থাৎ ছয়-সাত মাস পাঠদান ব্যাহত হবে। অপরদিকে ২০২৭ সালে নতুন কারিকুলাম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু হবে।
প্রসঙ্গত, অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শুরু হওয়া নতুন শিক্ষাক্রম স্থগিত করা হয়। ২০১৩ সাল থেকে শুরু হওয়া শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পাঠ্যবই প্রণয়ন করে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষাকার্যক্রম চলছে। ইতোমধ্যে অন্তবর্তী সরকার ঘোষণা দিয়েছে ২০২৭ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রম করা হবে। কিন্তু ২০২৬ শিক্ষাবর্ষকে সামনে রেখে একটি বছরের জন্য নতুন করে মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রণয়ন করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অন্তবর্তী সরকারের সময় গঠিত প্রাথমিক শিক্ষার কনসালটেশন কমিটির আহ্বায়ক ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, ‘‘এ ধরনের সিদ্ধান্ত কেন বারবার নেওয়া হয় বুঝি না। পরীক্ষাকে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া, সব কিছু পরীক্ষাকেন্দ্রিক করা ঠিক নয়। তারা কীভাবে কোন চিন্তায় এসব করছেন, এটা সুবিচিত হয়নি। এতে সমস্যা বাড়াবে। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা মূল্যায়ন, সেটা পাঠের অংশ। আলাদা করে পরীক্ষা নেওয়ার বেশি গুরুত্ব ভ্রান্ত একটি ধারণার বশবর্তী হয়ে এটি করছে। কারা করছে, কী মনে করে করছে, আমরা জানি না। এতে শিক্ষার্থীদের সমস্যা বাড়বে। আসলে পড়াশোনা ভালো করে করা দরকার। পরীক্ষা নিয়ে এত ঝামেলা করা ঠিক হবে না।’
জানতে চাইলে শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, ‘‘ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কিছু কিছু মানুষ মনে করে টেস্ট না হলে লার্নিং হবে না। মূলত বাস্তবতা হচ্ছে কারিকুলাম, শিক্ষকের প্রস্তুতি এবং টিচিং লার্নিং প্রসেস সম্পর্কিত। বহু বছরের অ্যাডভোকেসির ফলে আমরা অর্জন করেছিলাম, সরকারের সংশ্লিষ্টরা বুঝতে পেরেছিল যে আসলে আমাদের অনেক বেশি ধারাবাহিক মূল্যায়নের দিকে যেতে হবে। পরীক্ষা থেকে বেরোতে হবে।’’
তিনি বলেন, ‘‘সরকারের পট-পরিবর্তনের পর সব জায়গাতে হঠাৎ অনেক পরিবর্তন হওয়ার ফলে সিস্টেমের মধ্যে সেই জ্ঞানের ব্যবচ্ছেদ ঘটেছে। কিন্তু আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে বিগত সময়ে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে যেগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক, সেগুলো ধরে রেখে আরও ইতিবাচক সিদ্ধান্তের দিকে যাওয়া প্রয়োজন।’’
এনামুল হক বলেন, ‘‘আমি মনে করি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। পরীক্ষা পদ্ধতি বাদ দিয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতির দিকে যাওয়া উচিত। প্রশিক্ষণ না দিয়ে হঠাৎ করে একটি সার্কুলার দিয়ে শিক্ষাক্রম বা মূল্যায়ন নির্দেশনা দিলে তা বাস্তবায়নে ভালো ফল বয়ে আনে না। নতুন শিক্ষাক্রমে যাই আসুক, সে বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করা উচিত। এর আগে যে উদ্যোগগুলো প্রস্তুতি নিয়ে করা হয়েছে সেগুলো ভালো করেছে। আর যেগুলো হঠাৎ সার্কুলার দিয়ে করা হয়েছে, সেগুলো ভালো ফলাফল বয়ে আনেনি। শিশুদের ক্ষেত্রে যা কিছুই করি না কেন, তা সময় নিয়ে করা উচিত।’’
নতুন মূল্যায়ন নির্দেশিকার বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিটিবি’র চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, ‘‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই। আপনি প্রাথমিক শিক্ষাক্রমের সদস্যকে জিজ্ঞাসা করেন।’
প্রাথমিক শিক্ষাক্রমের সদস্য রিয়াদ আহমেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমি নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত। আমি দায়িত্ব পাওয়ার আগে মূল্যায়ন নির্দেশিকা করা হয়েছে।’’
নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতিতে নম্বর বণ্টন : প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি: প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ধারাবাহিক মূল্যায়ন ৫০ শতাংশ এবং সামষ্টিক মূল্যায়ন ৫০ শতাংশ। সামষ্টিক মূল্যায়নে রয়েছে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা। লিখিত পরীক্ষার মধ্যে বাংলা ৩৫ নম্বর, ইংরেজি ৩০ নম্বর, গণিতে ৪০ নম্বর। ব্যবহারিক পরীক্ষা বাংলা ১৫ নম্বর, ইংরেজি ২০ নম্বর ও গণিত ১০ নম্বরের। সামষ্টিক মূল্যায়ন প্রতি প্রান্তিকে একবার হবে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার সময় ১০০ নম্বরের দুই ঘণ্টা। আর ৫০ নম্বরের পরীক্ষা এক ঘণ্টার।
বিদ্যমান ব্যবস্থায় ধারাবাহিক মূল্যায়ন ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে। লিখিত পরীক্ষা ও মৌখিক বা ব্যবহারিক পরীক্ষা ছিল না।
তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ধারাবাহিক ও সামষ্টিক মূল্যায়ন : তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণি বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, বিজ্ঞান ও ধর্ম পরীক্ষা হবে ১০০ নম্বরের। বাংলা ও ইংরেজিতে ধারাবাহিক মূল্যায়ন ৩০ নম্বর, লিখিত পরীক্ষা ৫৫ নম্বর এবং মৌখিক/ব্যবহারিক পরীক্ষা ১৫ নম্বরের। গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, বিজ্ঞান ও ধর্ম শিক্ষা বিষয়ের ধারাবাহিক মূল্যায়ন ৩০, লিখিত পরীক্ষা ৬০ এবং মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বর ১০। শিল্পকলা এবং শারীরিক ও মানসিক শিক্ষা বিষয়ের ৫০ নম্বরের পরীক্ষায় ধারাবাহিক মূল্যায়ন ১৫, লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষা ৩৫ নম্বরের। লিখিত পরীক্ষা দুই ঘণ্টা ৩০ মিনিট এবং মৌখিক বা ব্যবহারিক পরীক্ষা দেড় ঘণ্টার।
প্রসঙ্গত, বিদ্যমান ব্যবস্থায় তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে লিখিত পরীক্ষা ছিল ৮০ নম্বরের এবং ছিল ধারাবাহিক মূল্যায়ন।