সুই বা রক্ত পরীক্ষা ছাড়াই রোগ শনাক্তে নতুন সম্ভাবনা ‘লিভিং সেন্সর ডিসপ্লে’

প্রশান্তি ডেক্স ॥ শরীরের ভেতরে প্রদাহ শুরু হলেও অনেক সময় তা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। উপসর্গ দেখা দিতে দেখা দিতে ততদিনে ভেতরে ক্ষত অনেক দূর এগিয়ে যায়। তবে নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, জীবন্ত ত্বকের একটি ছোট প্যাচ শরীরের ভেতরের প্রদাহ বাহ্যিক লক্ষণ প্রকাশের কয়েক মাস আগেই শনাক্ত করতে পারে। এতে সূই বা রক্ত পরীক্ষার প্রয়োজন ছাড়াই রোগ পর্যবেক্ষণের নতুন পথ খুলে যেতে পারে।

জাপানের ইউনিভার্সিটি অব টোকিও  এর গবেষকরা উদ্ভাবন করেছেন এই প্রযুক্তি, যার নাম ‘লিভিং সেন্সর ডিসপ্লে’। এই পদ্ধতিতে শরীরে প্রতিস্থাপিত বিশেষভাবে তৈরি ত্বক প্রদাহ বাড়লে নিজে থেকেই আলো বা উজ্জ্বল সংকেত দেখায়।

কীভাবে কাজ করে লিভিং সেন্সর ডিসপ্লে : এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক শোজি তাকেউচি। তার দল এমন ত্বককোষ ব্যবহার করেছে, যেগুলো শরীরের ভেতরে প্রদাহজনিত রাসায়নিক সংকেত অনুভব করতে পারে। প্রদাহ বাড়লে এসব কোষে জৈব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফ্লুরোসেন্ট আলো তৈরি হয়, যা ত্বকের উপরিভাগে দেখা যায়।

ত্বক যেহেতু নিয়মিত নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলে, তাই এই সেন্সর ব্যবস্থাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিকে থাকে। নতুন তৈরি হওয়া কোষগুলো পুরোনো কোষের মতোই প্রদাহ শনাক্ত করার ক্ষমতা ধরে রাখে। ফলে ব্যাটারি বা চার্জ ছাড়াই দীর্ঘদিন কাজ করতে পারে এই ‘জীবন্ত সেন্সর’।

পরীক্ষায় কী পাওয়া গেছে : প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, শরীরে প্রদাহ বাড়লে ত্বক প্যাচটি উজ্জ্বল হয় এবং প্রদাহ কম থাকলে আলো নিস্তেজ থাকে। প্রদাহ যত বেশি, আলো তত উজ্জ্বল। অন্য ধরনের সাধারণ ইমিউন প্রতিক্রিয়ায় তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি। এতে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এই প্রযুক্তি মূলত প্রদাহকেই নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করে।

গবেষণায় ইঁদুরের শরীরে এই ত্বক প্যাচ প্রতিস্থাপন করা হয়। প্রায় চার সপ্তাহ পর প্রতিস্থাপনজনিত প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কমে গেলে কৃত্রিমভাবে প্রদাহ সৃষ্টি করা হয়। তখন ত্বকের উপরিভাগে স্পষ্ট সংকেত পাওয়া যায়। প্রতিস্থাপিত ত্বকের পুরুত্ব ছিল মাত্র ১০০ মাইক্রোমিটার।

সূচ ছাড়াই বায়োমার্কার পর্যবেক্ষণ : এই প্রযুক্তির মাধ্যমে শরীরের ভেতরের বায়োমার্কার— যেগুলো রোগের অগ্রগতি নির্দেশ করে; ত্বকের ওপর থেকেই দেখা সম্ভব। খালি চোখে বা ক্যামেরা ব্যবহার করে এই সংকেত পড়া যাবে। তবে এটি এখনও রক্তে নির্দিষ্ট উপাদানের সঠিক মাত্রা জানাতে পারে না; বরং সময়ের সঙ্গে প্রদাহ বাড়ছে না কমছে, সেই প্রবণতা বুঝতে বেশি কার্যকর।

নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ : যেহেতু এখানে জিনগতভাবে পরিবর্তিত কোষ ব্যবহার করা হয়েছে, তাই মানবদেহে প্রয়োগের আগে নিরাপত্তা বড় প্রশ্ন। রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা যেন এই কোষ আক্রমণ না করে, সে জন্য আরও উন্নত জিন সম্পাদনা কৌশল প্রয়োজন। একই সঙ্গে গোপনীয়তা, সম্মতি এবং কোষ ছড়িয়ে পড়া রোধে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও জরুরি।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা : গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি শুধু প্রদাহ নয় হরমোনের পরিবর্তন, মানসিক চাপ বা অক্সিজেনের ঘাটতির মতো বিভিন্ন সংকেত শনাক্ত করতেও ব্যবহার করা যেতে পারে। পশুচিকিৎসা, অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণ পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণাগারে প্রাণীর ওপর চাপ কমাতেও এটি কাজে লাগতে পারে।

সব মিলিয়ে, লিভিং সেন্সর ডিসপ্লে প্রযুক্তি ত্বককে একই সঙ্গে সেন্সর ও ডিসপ্লেতে রূপান্তর করেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ন্যাচার কমিউনিকেশনস’-এ। মানবদেহে প্রয়োগের আগে আরও পরীক্ষা ও নীতিগত প্রস্তুতি প্রয়োজন হলেও, এটি ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.