আরো একটি নক্ষত্রের বিদায়

বিনম্র সালাম ও শ্রদ্ধা জানিয়েই বলছি আজ আমাদের পিতৃতুল্য অভিভাবক মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে দুনিয়ার সফল সফর ও মায়া ত্যাগ করিয়াছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মনের কথাগুলো পত্রিকার পাতায় তুলে ধরার চেষ্টা করলাম, ভুল ত্রুটি মার্জনার দৃষ্টিতে দেখবেন। যার কথা বলছি তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন সৈয়দাবাদ আদর্শ মহাবিদ্যায়ের প্রতিষ্ঠাকালীন এবং সফল অধ্যক্ষ জনাব সামসুল হক সাহেব। তিনি এই কলেজটিকে সফলতার দ্বারে পৌঁছে দিয়েগেছেন। যার স্বীকৃতি আজ সরকারী আদর্শ মহাবিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যা তিনিও চেয়েছিলেন কিন্তু তাঁর সময়ে করে দিয়ে যেতে পারেন নি কিন্তু যাত্রাটা শুরু করে দিয়ে গেছিলেন। আজ সেই স্বীর্কৃতি জনতার সম্মুর্খে। আমার দাদা মরহুম আলহাজ্জ্ব এবি সিদ্দিক সাহেব তৎকালীন সময়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনটি কাজ করেছেন, একটি হলো বাদৈর স্কুল করা এবং হাজিপুর স্কুল করায় সহযোগীতা আর তৃতীয়টি হলো এই সৈয়দাবাদ গ্রামে সৈয়দাবাদ আদর্শ মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে তিনি যাকে বেছে নিয়েছেন এবং অগাধ বিশ্বাসে দায়িত্ব দিয়েছেন আর সেই দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সাথে রক্ষা করেছেন এবং সেই দায়িত্বের পরিপূর্ণ রূপদান করেছেন সেই তিনিই হলেন আজকের প্রয়াত অধ্যক্ষ আলহাজ্জ্ব সামসুল হক সাহেব।

তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় শৈশব থেকেই। বিশেষ করে যখন বুঝতে শিখেছি এবং হাটাচলা ও কথা বলতে পারি তখন থেকেই। এক কথায় পারিবারিক সম্পর্ক। আমার দাদা আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন স্যারের সাথে এবং স্যারের স্ত্রীর সাথে। পরিচয়টা ছিল ফুফা এবং ফুফু হিসেবে। স্যার দাদাকে শ্বশুর সম্বোধন করতেন আর খালাম্মা দাদাকে বাবা (ধর্মের বাবা) সম্বোধন করতেন। সেই থেকেই পরিচয় এবং ঘনিষ্ট সম্পর্ক। দুই পরিবারের মধ্যে যাতায়ত এবং ঘনিষ্টতায় বড় আপাদের আদর স্নেহ যেন একটি যৌথ পরিবারের পারিবারিক বন্ধনে অটুট ছিল।

পরবর্তীতে স্যারের বড় ছেলে বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত একজন সুখ্যাতি অর্জনকারী ব্যক্তি জনাব ফারুক আহমেদ আমার ছাত্রজীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে আভির্ভূত হয় যা আজও অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। সেই বন্ধুত্বের সর্ম্পর্ক এবং আত্মীয়তার বন্ধন এই দুইয়ে মিলে একটি শক্তিশালি ভিত্তি তৈরী হয় এবং সেই ভিত্তিতেই এখনও মজবুত অবস্থান সুদৃঢ় রয়েছে।

সেই সময়ের বড় বোনদের আদর শাসন এবং ছোট বোন ও ভাইদের আবার আমাদের শাসন উভয়েই যেন এক শান্তি ও অমলিন আনন্দ ছিল। এইভাবেই চলছিল সেইদিনগুলো। বড় আপাদের বিবাহ এবং তাদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া ও দোলাভাইদের আদর ভালবাসা যেন একক সৌন্দয্য ও ঐতিহ্যবহ নি:শর্ত ভালবাসার বন্ধন ছিল।

ছাত্র জীবন থেকেই স্যারকে অধ্যক্ষ স্যার হিসেবে চিন্তা করিনি কারণ তিনি আত্মীয় এবং বন্ধুরও বাবা। তবে যখন কলেজে অধ্যয়ন করি তখন স্যার’র সামনে গিয়ে স্যার সম্বোধনই করেছি এবং বিভিন্ন প্রয়োজনে সাহায্যের গিয়েছি;  সহযোগীতা পেয়েছি। টাকা ছাড়া নিজের ফরম ফিলাপ আর বন্ধুদের এমনকি এলাকার অসামর্থদেরও টাকা ছাড়া ফরম ফিলাপ করিয়েছি। স্যার হাসিমুখে সব মাফ করে পরিক্ষার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এছাড়াও বিভিন্ন প্রয়োজন তিনি হাসিমুখে সামাল দিয়েছেন। ঐ সময় সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্বটুকু স্যার আর খালাম্মা পালন করেছেন।

সকালের নাস্তা খাওয়ার দৃশ্য এবং কথোপকথনগুলো আমৃত্যূ মনে থাকবে। তবে জীবনের প্রয়োজনে এবং কর্মের তাগিদে গ্রাম ছেড়ে শহুরে জীবনে পদার্পন করার পর মাঝে মাঝে দেখা সাক্ষত হতো আর তখনই বিভিন্ন উপদেশ দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিত। এই যে সম্পর্ক তা বুলার নয়। কিন্তু এইভাবেই সম্পর্কগুলো পাকাপোক্ত হয়। একসময় স্যার সৈয়দাবাদ কলেজ থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং অন্য আরেকটি কলেজে অধ্যক্ষের চাকুরী নিয়ে সৈয়দাবাদ কলেজের সমাপ্তি টানেন। তখনও স্যার আমাদের গ্রামেই ছিল আর আমরা সবাই চেষ্টাও করেছি স্যারকে আমাদের গ্রামে রাখতে। কিন্তু পারিনি।

শিপন, আমি ও আমার শ্রদ্ধেয় প্রয়াত চাচা (ওকিল শ্বশুর)  শিপনের বাবা জনাব মরহুম শাজাহান মাষ্টার সাহেব বহুবার বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছেন স্যারকে সৈয়দাবাদ গ্রামে স্থায়ীভাবে রেখে দেয়ার জন্য। কারণ গ্রামবাসী এবং এই গ্রামটি ওনার সাথে আত্মার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল। ওনি এই গ্রামের না এই কথাটি এই গ্রামের কোন মানুষ বিশ্বাস করতে পারেনি। সবাই জানত ওনি সৈয়দাবাদ গ্রামেরই একজন।

সবশেষে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি তার শৈশবের স্মৃতিমাখা পৈত্রিক বাড়িতে ফিরে যবেন। আমরা তখন হতাশ এবং ভগ্ন হৃদয়ে স্বদ্ধ হয়ে ওনার পরামর্শ ও শেষ কথাগুলো শুনতাম। খালাম্মা যাওয়ার আগে গ্রামের প্রতিটি জায়গায় যেখানে তিনি বহুবার পা রেখেছিলেন সেই জায়গাতে পা দিয়েই বিদায় নিয়েছেন। আমি ও আমরা সকলে স্যারকে সুন্দরভাবে বাহাদুর গ্রামে পৌঁছে দিই। আর মনে করি বাহাদুরপর গ্রামটিও আমাদের। কারণ ওখানেও আমাদের একটি বাড়ি আছে।

এখানেও একটি কথা স্মৃতিময় এবং গভীরতার অন্তরালে আজীবন বেঁচে থাকবে। যখন স্যার ও খালাম্মা সৈয়দাবাদ থেকে চলে যায় তখন আমি কসবায় ব্যবসা করি এবং কসবাতে বাসা নিয়ে থাকি। সেইসময় ছোট ভাই শিব্বির আড়াইবাড়ি মাদ্রাসাতে পড়ে। স্যার আমাকে বলল; বাবা তোমাকে সেই ছোট থেকে আমি ছেলের স্নেহ ও ভালবাসায় আগলিয়ে রেখেছি। আজ যাওয়ার সময় একটি কথা বলব, শোন সৈয়দাবাদ গ্রামে অনেক আত্মীয় ও পরিচিতজন রয়েছে কিন্তু সেইখানে এই কথাটি বলিনাই কিন্তু তোমাকে আলাদা করেই বলছি, আমি ফারুক এবং তোমাকে একই দৃষ্টিতেই দেখি, তাই বলছি যাওয়ার সময় শিব্বিরকে তোমার কাছে রেখে গেলাম। তুমি দেখবে এবং খোজ খবর রাখবে। সে তোমার ছোট ভাই। সেই থেকে আমার দায়িত্ব আরো বেড়ে গেল। সেই সময় আমি আর শিব্বির এক বিছানায়ই থেকেছি এবং দুইভাই একই সাথে খেয়ে দেয়ে সম্পর্কের গভীরতাটুকু জন্মজন্মান্তরের করেছি যা আজও অব্যাহত রেখেছি। তবে শিব্বিরের খাবার খরচ স্যার পৌঁছে দিত। তখন আমি রাগ করে বলতাম এটা কেমন কথা। তখন স্যার তাঁর সন্তানকে কোন কিছু দিলে সন্তান না নিলে কেমন হয় আরো ইত্যাদি বলে আমাকে সন্তানের যন্ত ও আদরের গভীরতায় ভাসিয়ে দিত। আমি যা কখনো ভুলব না।

তারপর বহুবার স্যার’র সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে. তখন স্যার আমাকে বুকে জড়িয়ে বাবা সম্বোধন করে অন্তত দুই মিনিট রাখতেন তারপর কতো আদর করে গা বুলিয়ে দিতেন। এই স্মৃতিগুলো ভুলার নয় আর ভুলবও না। আমার স্ত্রী সন্তানদেরও শ^শুর ও দাদা নাতি নাতনির স্নেহ ভালবাসায় মাতাতেন। তবে এটা খুবই অল্প সময়ের হতো। তবে লিখা শেষ করার কোন সুযোই নেই তারপর শেষ করতে হবে। খালাম্মা মারা যাবার পর দুইবার স্বপ্নে আমার সঙ্গে খালাম্মার কথা হয় এবং খুব হাস্যোজ্জ্বল অবস্থায় দেখি। যা সেই জীবদ্দশার হাস্যোজ্জ্বল খালাম্মাকেই খুজে পাই। আল্লাহ স্যার ও খালাম্মাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ আসনে সমাসিন করান এই কামনা ও দোয়া মোনাজাত অব্যাহত রাখি। একটি বিষয় হলো স্যার ধার্মীক এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়তেন কোন সময় গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য মিস হলে কাজা নামাজ পড়তেন এবং সবসময় তজবি জপতেন। এই হল সারের সারা জীবনের আমল। আর এইগুলো আমাদেরকে শিক্ষা দিতেন। একসঙ্গে চর্চার মাধ্যমে বাস্তবায়নও করাতেন। একটি আক্ষেপ হলো শেষ সময় স্যারকে দেখতে না পারার। একবার অসুস্থ্য হলো সেই সময় আমিও অসুস্থ আর অসুস্থ্য শরীর নিয়ে অসুস্থ্য রোগির কাছে যাই নাই। আর এইবার আমার শ্বশুর দুইমাস যাবত এবার কেয়ার হাসপাতালের সিসিইউ হয়ে লাইফ সাপোর্ট ছিলেন এবং আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে তিনি আবার সুস্থ্য হয়ে বাসায় ফিরেন কিন্তু শয্যাশায়ী যার দেখাশুনা একজন নার্স এবং আমি মিলেই করি। তারপর আবার হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সিসিইউতে আর এই সময়ই স্যারের চির বিদায়। আক্ষেপ হলো আমার হাত বাধা যার জন্য স্যারকে শেষ বিদায় জানাতে পারলাম না। তবে অন্তরের গভীর থেকে দোয়া করি এবং করব আর সম্পর্কগুলো অক্ষত রাখব। এই বলেই মনের গহীনের কথা শেষ করলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published.