প্রশান্তি ডেক্স ॥ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এই দুই ভাগে বিভক্ত করার বহুল আলোচিত উদ্যোগ অন্তবর্তী সরকারের আমলেই কার্যত থমকে যাচ্ছে। আইনি ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা, প্রশাসন ক্যাডারের বিরোধিতা, এনবিআরের ভেতরে আন্দোলন, কর্মকর্তাদের শাস্তি এবং রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব সব মিলিয়ে এই কাঠামোগত সংস্কার এখন গভীর অনিশ্চয়তায়।

অধ্যাদেশ জারির পরও প্রয়োজনীয় বিধি-বিধান ও প্রক্রিয়াগত প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় বিভাজন কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। প্রশাসন ক্যাডারের বিরোধিতা, সচিব নিয়োগ সংক্রান্ত জটিলতা এবং আইনি নোটিশ পুরো উদ্যোগকে নির্বাচনের আগে স্থগিত করেছে।
সরকারের সংশ্ল্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের আগে এত বড় প্রশাসনিক পুনর্গঠন সম্পন্ন করার মতো সময়, প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক ঐকমত্য কোনোটাই আর অবশিষ্ট নেই। ফলে এনবিআর বিলুপ্ত করে নতুন দুটি বিভাগ গঠনের পুরো উদ্যোগটি আপাতত স্থবির হয়ে পড়েছে।
সংশ্ল্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এসে প্রশাসন ক্যাডারের একটি অংশের বিরোধিতা, আইনি নোটিশ এবং সচিব নিয়োগকে কেন্দ্র করে দ্বন্ধে পুরো প্রক্রিয়াটি কার্যত অচল হয়ে গেছে। এতে একদিকে প্রশাসনিক বিভক্তি গভীর হয়েছে, অন্যদিকে শতাধিক কর্মকর্তার ক্যারিয়ার অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
আইনি নোটিশে নতুন মোড় : সূত্র জানায়, গত ২৮ জানুয়ারি এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ গঠনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সাতজন সচিবকে আইনি নোটিশ পাঠান মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক যুগ্ম সচিব তানভীর আহমেদ। নোটিশে সংশ্ল্লিষ্ট অধ্যাদেশ বাতিল বা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।
নোটিশে বলা হয়, অধ্যাদেশটি সচিব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের কার্যত বাদ দিয়েছে। এতে তাদের পদোন্নতির অধিকার, চাকরির শর্ত, প্রশাসনিক কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা বেআইনিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিন দিনের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়।
এদিকে প্রশাসন ক্যাডারের সিনিয়র কর্মকর্তাদের একটি অংশ ইতোমধ্যে অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নির্বাচনের আগে নতুন দুই বিভাগে সচিব নিয়োগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন। তাদের যুক্তি নির্বাচনের প্রাক্কালে এমন বড় প্রশাসনিক পুনর্গঠন ভবিষ্যতে আরও জটিলতা তৈরি করতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে দুই বিভাগে পৃথক সচিব নিয়োগসহ সংশ্ল্লিষ্ট কার্যক্রম বর্তমান সরকারের সময়ে আর এগোচ্ছে না বলে জানিয়েছে এনবিআরের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র।
অধ্যাদেশ জারি : ২০২৫ সালের ১২ মে সরকার ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে এনবিআরকে দুই ভাগে বিভক্ত করার উদ্যোগ নেয়। সরকারের যুক্তি ছিল রাজস্বনীতি প্রণয়ন এবং রাজস্ব আদায় ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব আলাদা করলে কর প্রশাসনে দক্ষতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বাড়বে।
এনবিআরের ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়া : অধ্যাদেশ জারির পরপরই এনবিআরের কর, ভ্যাট ও কাস্টমস ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। তাদের অভিযোগ ছিল কোনও ধরনের আলোচনা ছাড়াই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। নীতিনির্ধারণী পদে অ-রাজস্ব ক্যাডারের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। এর জেরে এনবিআর সদর দফতরসহ দেশের বিভিন্ন কর ও শুল্ক দফতরে কর্মবিরতি ও প্রতিবাদ শুরু হয়।
অফিস বন্ধ, রাজস্ব আদায়ে ধাক্কা: আন্দোলনের কারণে একাধিক দিন কর অফিস, ভ্যাট কমিশনারেট ও কাস্টমস হাউজ আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ থাকে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে রাজস্ব আদায়ে। চলতি অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত নেমে আসে ৬.৬ শতাংশে, যেখানে আগের অর্থবছরে তা ছিল ৭.৪ শতাংশ। সরকারের জন্য এটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়।
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা: উত্তেজনার চূড়ান্ত রূপ- সরকার আন্দোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। এর ধারাবাহিকতায় সততার জন্য পরিচিত চার জন সিনিয়র কর, ভ্যাট ও কাস্টমস কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। একজন কমিশনারকে সরাসরি অবসরে পাঠানো হয়। আন্দোলনে সম্পৃক্ততার অভিযোগে প্রায় ৩৫ জন কর্মকর্তা বরখাস্ত বা সাময়িক বরখাস্ত হন। একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের মাধ্যমে তদন্ত শুরু হয়। এতে প্রশাসনের ভেতরে আতঙ্ক ও ক্ষোভ আরও তীব্র হয়।
অধ্যাদেশ সংশোধন, তবু সংকট কাটেনি : বিরোধিতা সামাল দিতে সরকার পাঁচ সদস্যের একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করে। পরে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অধ্যাদেশ সংশোধন করে পুনরায় জারি করা হয়। সংশোধনীতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগে রাজস্ব ক্যাডারের আধিপত্য নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। নীতি বিভাগে অর্থনীতি, বাণিজ্য ও করনীতিতে অভিজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তবে এনবিআরের বড় একটি অংশ মনে করে, মূল কাঠামোগত সমস্যা রয়ে গেছে।
আইনি ‘ল্যাবিরিন্থে’ আটকে প্রক্রিয়া : পরবর্তী সময়ে বিষয়টি আইনি বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে অধ্যাদেশটি সংবিধানের ৫৫ (৬) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রুলস অব বিজনেস ১৯৯৬ অনুযায়ী কোনও বিভাগ বাস্তবায়ন ক্ষমতা রাখতে পারে না। ক্যাডার কম্পোজিশন রুলস ১৯৮০ সহ একাধিক বিধি সংশোধন ছাড়া বিভাজন কার্যকর করা সম্ভব নয়। ফলে পুরো প্রক্রিয়া আইনি জটিলতার জালে আটকে যায়।
রুলস অব বিজনেসে অচলাবস্থা : যদিও জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার) সম্প্রতি রুলস অব বিজনেস ও অ্যালোকেশন অব বিজনেস খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়, তবে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদন এখনও ঝুলে আছে। ধারাবাহিকভাবে সভা বাতিল হওয়ায় স্পষ্ট হয়ে যায় অন্তবর্তী সরকারের মেয়াদে বিভাজন সম্পন্ন হওয়া কঠিন।
কর্মকর্তাদের শাস্তি লঘু : আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকজন কর্মকর্তার শাস্তি পুনর্বিবেচনা করে লঘু দন্ড দিয়ে চাকরিতে ফেরানোর প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগের (আইআরডি) এক প্রজ্ঞাপনে ট্যাক্স ক্যাডারের অতিরিক্ত কমিশনার সেহেলা সিদ্দিকাকে চাকরিতে ফেরানো হয়েছে। তবে পদোন্নতি এক বছর স্থগিত ও বেতন গ্রেড দুই ধাপ কমানো হয়েছে। এই ধরনের লঘু দন্ডে ফেরানো প্রক্রিয়া আরও প্রায় ২৫ জন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে চলছে।
তবে শীর্ষ পর্যায়ের পাঁচ জন কর্মকর্তাকে যে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল, তাদের ক্ষেত্রে কোনও পুনর্বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়নি।
বিশ্বে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা : ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এনবিআর বিভাজনকে ঘিরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা বিশ্বে কোনও রাজস্ব প্রশাসনে দেখা যায়নি। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এবং মূল রাজস্ব সংগ্রহকারীদের সম্পৃক্ত না করেই এড-হক ভিত্তিতে বিভাজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, ‘‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব প্রশাসন আলাদা করার ধারণার সঙ্গে তিনি একমত হলেও, নীতি বিভাগকে অবশ্যই আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি স্বাধীন কাঠামোতে গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য ছেড়ে দেওয়াই যুক্তিসঙ্গত।’’
সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ মনে করেন, বর্তমান কাঠামো মূলত কার্যকর এবং ছোটখাটো অসঙ্গতি পরবর্তী সরকার সংশোধন করতে পারবে। তবে অর্থনীতিবিদ ড. মাসরুর রিয়াজের মতে, নির্বাচিত সরকারের হাতে এই সিদ্ধান্ত ছেড়ে দেওয়াই হবে অধিকতর দায়িত্বশীল পথ।
অবশ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব আদায় এই দুই ভাগে বিভক্ত করার প্রক্রিয়া আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই সম্পন্ন হতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজটি শেষ না হলেও অন্তবর্তী সরকারের আমলেই এই গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি।
গত মঙ্গলবার (৭ জানুয়ারি) সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন অর্থ উপদেষ্টা। গত ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এনবিআর বিভক্ত করার ঘোষণা থাকলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, “দেখুন, ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের মধ্যে হয় কিনা। সব আনুষ্ঠানিকতা প্রায় শেষ। ছোট একটা বিষয় আছে। অন্তবর্তী সরকারের আমলেই এটা হবে।’’
নির্বাচনের আগে দুই বিভাগের বাস্তবায়ন ঝুলে যাওয়ার বিষয়ে এনবিআরের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রশাসন ক্যাডারের সহযোগিতা ছাড়া এমন বড় প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা কঠিন। তাদের অনীহার কারণে পুরো প্রক্রিয়ার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে।’’
অর্থাৎ, সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দুই ভাগে বিভক্ত করার বিষয়টি আপাতত পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের কাঁধে গড়িয়ে যাচ্ছে।