প্রশান্তি ডেক্স ॥ ভোটের মাঠ এখন আর শুধু পোস্টার, মিছিল বা জনসভায় সীমাবদ্ধ নেই-প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তথ্য ও অপতথ্য ছড়িয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করাও প্রায় ‘ভোটযুদ্ধের’ সমান শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। মাঠের রাজনীতির পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব, ফেসবুক পোস্ট, হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ-সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে নানা দাবি, অভিযোগ, আতঙ্ক ও গুজব।

অনেক ক্ষেত্রে এসবের উদ্দেশ্য কেবল বিভ্রান্তি সৃষ্টি, ভোটারদের ভয় দেখানো বা নির্দিষ্ট পক্ষকে সুবিধা দেওয়া। আবার কখনও সত্য ঘটনাকেও ‘এআই দিয়ে বানানো’ বলে অস্বীকার করা হয়। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে ভোটার, প্রার্থী ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। তবেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং সহিংসতার ঝুঁকি কমবে।
গুজব কীভাবে ছড়ায়: ফেসবুক লাইভ বা ভুয়া আইডি থেকে ‘ব্রেকিং নিউজ’ দাবি করে বিভিন্ন গণমাধ্যমের নাম-লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ড বানানো হচ্ছে। পুরনো ভিডিও নতুন বলে সম্প্রচার, অন্য দেশের ছবি বাংলাদেশের বলে চালানো, কিংবা ব্যালট নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ানো-এসব এখন সাধারণ কৌশল।
নির্দিষ্ট দলের পক্ষে যেমন অতিরিক্ত ব্যালট ছেপে রাখা, সিল মারা ব্যালট প্রস্তুত, ‘হ্যাঁ’ ভোটের ব্যালট মজুত- এ ধরনের ভিত্তিহীন দাবি ছড়ানো হয়। এছাড়া ‘অমুক কেন্দ্রে ভোট বন্ধ’, ‘সহিংসতা শুরু’, ‘কয়েকজন নিহত’, ‘সেনা নেমেছে’ এমন আতঙ্কমূলক পোস্ট মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, একটি গুজব ছড়াতে পাঁচ মিনিটও লাগে না। কিন্তু সেটি খন্ডন করতে লাগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ততক্ষণে পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
কারা ছড়ায় এসব? : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পক্ষপাতদুষ্ট কর্মী-সমর্থক, বট নেটওয়ার্ক, বিদেশি বা সংগঠিত প্রোপাগান্ডা গ্রুপ এবং ভিউ-ভাইরালের লোভে কিছু ইউটিউব চ্যানেল থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ায়। লক্ষ্য থাকে ভোটার উপস্থিতি কমানো বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে প্রভাবিত করা।
মনিটরিংয়ে সরকার : অনলাইনের গুজব প্রতিরোধে সরকারের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, সিআইডি, সশস্ত্রবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার পৃথক মনিটরিং সেল রয়েছে।
গত নভেম্বরে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভুয়া তথ্য ও গুজব প্রতিরোধে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সি (এনসিএসএ) একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে। এই সেল বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে সার্বক্ষণিকভাবে অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করছে এবং তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করছে।
সতর্কতার পরামর্শ : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘‘নির্বাচনের সময় গুজব সবচেয়ে বড় অস্থিতিশীলতার কারণ হতে পারে। তাই যাচাই ছাড়া কোনও খবর বা পোস্ট শেয়ার করা ঠিক হবে না।’’
জোহার মতে, সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ছবি, ভিডিও বা অডিও অনেক সময় পুরনো বা সম্পাদিত হয়, যা বিভ্রান্তি তৈরি করে। সহিংসতা, ভোট জালিয়াতি বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কোনও তথ্য পেলে তা নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম বা নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল সূত্র থেকে যাচাই করা জরুরি।
অপরিচিত নম্বর বা সন্দেহজনক লিংক থেকে আসা বার্তা বা অ্যাপ ডাউনলোড করা থেকেও বিরত থাকার পরামর্শ দেন তানভীর হাসান জোহা। তিনি বলেন, ‘‘এগুলো ব্যক্তিগত তথ্য চুরি বা ডিভাইস হ্যাকের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’’
গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য চোখে পড়লে তা ছড়ানোর পরিবর্তে স্থানীয় প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘সচেতন নাগরিকের দায়িত্বশীল আচরণই একটি শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে।’’