প্রশান্তি ডেক্স ॥ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। নির্বাচনকে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য করতে সারা দেশে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ভোটের মাঠে মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ সদস্যের বিশাল নিরাপত্তা বলয়। বাহিনীগুলোর প্রধানরা বলছেন, এবারের নির্বাচনকে তারা একটি ‘উদাহরণ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান যেখানে ভোট হবে শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর ও অংশগ্রহণমূলক।

নির্বাচনি দায়িত্বে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা ইতোমধ্যে অবস্থান নিয়েছেন। ‘ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় সেনাবাহিনীকে আগেই সারা দেশে মোতায়েন করা হয়েছে। তারা টহল দিচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এবং পরিচালনা করছেন নির্বাচনি মহড়া। একইসঙ্গে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে চলছে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠপর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশন ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছে। তারাও কাজ শুরু করেছেন। তবে ব্যাপক প্রস্তুতির মধ্যেও জনমনে কিছু শঙ্কা রয়ে গেছে। বিশেষ করে নেত্রকোনায় পাঁচটি ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ এবং বগুড়ায় দুই রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষের ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আকাশপথের নিরাপত্তা দেবে বিমানবাহিনী। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে বলা হয়েছে, গত ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে ২৭৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন পাঁচজন। সহিংসতার ঘটনাগুলো ১১টি শ্রেণিতে ভাগ করে দেখা গেছে, প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থীদের মধ্যেই সংঘর্ষ হয়েছে ৮৯টি।
গত সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাতে বগুড়ার পারশুন গ্রামে ভোট কেনাবেচার অভিযোগ ঘিরে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. আতোয়ার হোসেন।
অপরদিকে, নেত্রকোনার পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ভিত্তিক ভোটকেন্দ্রে গভীর রাতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এরপর সেখানে গ্রাম পুলিশ মোতায়েনসহ নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
উপকূল অঞ্চলে নির্বাচনকালে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন নৌবাহিনীর সদস্যরানির্বাচনি নিরাপত্তায় বাহিনীগুলোর সংখ্যা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দায়িত্বে রয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, বিজিবির ৩৭ হাজারের বেশি, কোস্টগার্ডের সাড়ে ৩ হাজার, পুলিশের প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার এবং আনসারের ৫ লাখ ৬৭ হাজার সদস্য। র্যাব সদস্যরাও মাঠে থাকবেন। অভিযোগ বা সহিংসতার খবর দ্রুত পেতে চালু করা হয়েছে নির্বাচনি সুরক্ষা অ্যাপ। পাশাপাশি ব্যবহৃত হবে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও ডগ স্কোয়াড।
গত মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি বাহারুল আলম জানিয়েছেন সারা দেশে তিন স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে থাকবে স্ট্যাটিক ফোর্স, বাইরে টহল দেবে মোবাইল টিম এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবে স্ট্রাইকিং ফোর্স। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা থাকবে।
সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন র্যাবের সদস্যরা প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির কথাও উল্লেখ করেন আইজিপি। তিনি জানান, নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে থাকবে বডি ক্যামেরা, প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে ড্রোন।
অবৈধ অস্ত্রকে বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে আইজিপি জানান, লুট হওয়া লাইসেন্সকৃত অস্ত্রের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৩৩০টি উদ্ধার করা হয়েছে। অবশিষ্ট অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত আছে।
এদিকে রাজধানীজুড়ে শুরু হয়েছে যৌথবাহিনীর টহল ও মহড়া। গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। সন্দেহভাজন যানবাহন ও ব্যক্তিদের তল্লাশি করা হচ্ছে। ধানমন্ডি, খামারবাড়ি, বসিলা, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকায় চলছে কড়া নজরদারি। তবে শুনসান নিবরতায় এক ভুতুড়ে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে নিরাপত্তা চৌকি বা তল্লাসীর স্থান ছাড়া খুব কমই চোখে পড়ে মহড়া বা বিশেষ অভিযান বা পুরিশী তৎপরতা। তবে সেনাবাহিনী তল্লাসী অভিযান পরিচালনা করেছেন বিভিন্ন পয়েন্টে। তবে এটা সরেগড়ে সবাইকেই করেছেন। সাংবাদিকগন দায়িত্ব পালনার্থে গাড়ি নিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়তকালে বহুবার বা একাধিকবার তল্লাসীর ঝামেলায় পড়েছেন। সাংবাদিকদের গাড়িতে নির্বাচন কমিশনের ষ্টিকার থাকা সত্ত্বেও এই তল্লাসী পরিচালনা করেছেন। যা বিরক্তিকর বা হয়রানীমুলক। একবার তল্লাসীই যথেষ্ট কিন্ত কেন বারবার?
সড়কে তল্লাশি চালান পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। শাহবাগ থানার ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, অবৈধ দ্রব্য বা অস্ত্র বহন ঠেকাতে নিয়মিত তল্লাশি চলছে। বনানী থানার ওসি কাজী রফিক আহমেদ জানান, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান বলেন, শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে প্রতিটি থানাকে চেকপোস্ট ও পেট্রোল জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া জরুরি মুহূর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ১ হাজার ১৯১টি সশস্ত্র টিম স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে প্রস্তুত রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রশাসনের প্রত্যাশা, নিরাপত্তার এই কঠোর বলয়ের মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসে একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া যাবে।