প্রশান্তি ডেক্স ॥ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকটের সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) গত বৃহস্পতিবার এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ইরানের নতুন দফা হামলার কারণে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর এ খবর জানিয়েছে।

হামলার তীব্রতা সরাসরি দৃশ্যমান হচ্ছে বাহরাইনে। মুহররাক দ্বীপের জ্বালানি ট্যাংকে হামলার পর সেখানে ঘন কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার এবং জানালা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোনের আঘাতে আবারও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। দুবাইয়ের প্রাণকেন্দ্রে ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব জানিয়েছে তারা তাদের শায়বাহ তেলক্ষেত্র এবং দূতাবাস এলাকা লক্ষ্য করে ধেয়ে আসা ড্রোন প্রতিহত করেছে।
প্যারিসভিত্তিক জ্বালানি বিষয়ক বিশ্ব কর্তৃপক্ষ আইইএ জানিয়েছে, ১৩ দিন ধরে চলা এই সংঘাত বিশ্ব তেলের বাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে, যা ১৯৭০-এর দশকের সংকটকেও ছাড়িয়ে যাবে। উপসাগরীয় দেশগুলোর তেলের উৎপাদন দৈনিক অন্তত ১ কোটি ব্যারেল কমে গেছে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, শত্রুতা কমার কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে তেলের দাম ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানি হুমকি ও হামলার কারণে তেলের ট্যাংকার চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
ইরানের শীর্ষ এক সামরিক কর্মকর্তা বুধবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরান দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে যা বিশ্ব অর্থনীতিকে ‘ধ্বংস’ করে দেবে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান আসন্ন পরাজয়ের মুখোমুখি।
ট্রাম্প বলেন, তেহরান এখন ‘খাদের কিনারে’ দাঁড়িয়ে আছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, মার্কিন বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু শেষ হয়ে এলেও এই সামরিক অভিযান এখনই শেষ হচ্ছে না। তিনি এমন অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছেন যা পুনর্গঠন করতে এক প্রজন্ম সময় লাগবে।
মেডিটেরেনিয়ান ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক পিয়েরে রাজৌক্স বলেন, হোয়াইট হাউস যদি মনে করে ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইলেই এই যুদ্ধ থেমে যাবে, তবে তারা ভুল করছে। ইরানি শাসকের আর হারাবার কিছু নেই। তারা আগ্রাসনের প্রতিশোধ নিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।
যুদ্ধের বিস্তার এখন পুরো অঞ্চলে। লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বৈরুতের সমুদ্র সৈকতে আরও আটজন প্রাণ হারিয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মতে, ইরানের ভেতরেই ৩০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। লেবাননে নিহতের সংখ্যা ৬৩০ ছাড়িয়েছে এবং ৮ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়েছে। ইরানি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, সেখানে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ২০০ ছাড়িয়েছে।
তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বৈশ্বিক সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়, তা এখন কার্যত অচল। তেহরান ঘোষণা দিয়েছে, হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত উপসাগর থেকে এক লিটার তেলও রফতানি হতে দেওয়া হবে না।
আইইএ-এর সমন্বয়ে বিশ্বের প্রধান ভোক্তা দেশগুলো তাদের কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার ঘোষণা দিলেও বাজারের আতঙ্ক কাটছে না। এসপিআই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের স্টিফেন ইন্নেস এই পদক্ষেপকে বর্ণনা করেছেন এভাবে, ট্রেডিং ডেস্কের ভাষায় আইইএ-র এই তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত হলো শোধনাগারের বিশাল আগুনে বাগানের পানির পাইপ দিয়ে পানি ছিটানোর মতো।
পেন্টাগনের এক ব্রিফিং অনুসারে, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। দুবাই থেকে অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের সরিয়ে নিচ্ছে। সব মিলিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতি।