প্রশান্তি ডেক্স ॥ নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর ঐক্যের ডাক, শোকপ্রস্তাবে দন্ডিতদের নাম নিয়ে বিতর্ক এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় নজিরবিহীন হট্টগোল ও ওয়াকআউটের মধ্য দিয়ে শেষ হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশন।

গত বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সকালে উৎসবমুখর পরিবেশে অধিবেশন শুরু হলেও দিনের শেষভাগে তা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করলেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
সাংবিধানিক বিধিবদ্ধ নিয়ম অনুসারে কিছুটা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে উদ্বোধনী ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সকাল ১১টায় প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে সংসদের কার্যক্রম শুরু হয়।
বাংলাদেশের সংসদীয় রীতিনীতির ইতিহাসে এই ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন নয় উল্লেখ করে তিনি ১৯৭৩ সালের প্রেক্ষপ্ট তুলে ধরেন। সেই সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ওই সংসদের সদস্য মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশের নাম সভাপতি হিসেবে প্রস্তাব করেছিলেন এবং তিনিই উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন।
সংসদীয় রীতি অনুযায়ী তিনি নতুন স্পিকার হিসেবে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার হিসেবে ব্যারিস্টার কায়সার কামালের নাম ঘোষণা করেন। পরে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাদের শপথ পাঠ করান। নিরপেক্ষতার স্বার্থে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার তাদের দলীয় পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন।
শোকপ্রস্তাবে বিতর্ক, স্থান পেলেন দন্ডিত জামায়াত নেতারাও। অধিবেশনের শুরুতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ দেশি বিদেশি বিশিষ্টজন, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নিহত এবং মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে শোকপ্রস্তাব আনা হয়।
তবে বিতর্কের জন্ম দেয় জামায়াতের প্রয়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, আব্দুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানান। উল্লেখ্য, এই সাতজনই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দন্ডিত ছিলেন।
বিরোধী দলের প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন ও ওয়াকআউট। মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় বিরোধী দলের ওয়াকআউট। বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ভাষণ দিতে দাঁড়ালে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মাইক না পাওয়ায় তিনিসহ অন্য সদস্যরা প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদ জানান। এ সময় এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ ‘কিলার চুপ্পু, বয়কট চুপ্পু’ ে¯্লাগান দেন।
বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান রাষ্ট্রপতিকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে তার বক্তব্য শুনতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর বিরোধী দলের সদস্যরা ‘গেট আউট’ ে¯্লাগান দিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। সংসদ কক্ষ ত্যাগ করার পরপরই হাসনাত আব্দুল্লাহ ফেসবুকে ‘গেট আউট চুপ্পু’ লিখে পোস্ট দেন, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। তবে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতেই রাষ্ট্রপতি তার ভাষণ অব্যাহত রাখেন।
রাষ্ট্রপতিকে খুনির সহযোগী বললেন বিরোধী দলীয় নেতা: সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রতিবাদে জামায়াতের আমিরের নেতৃত্বে ওয়াকআউট করেন বিরোধী দলীয় এমপিরা। পরে গণমাধ্যমকর্মীদের তিনি বলেন বলেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অপরাধী। তিনি সব খুনির সহযোগী ছিলেন। একটি খুনের বিষয়েও তিনি ব্যবস্থা নেননি। অভিভাবক হিসেবেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। তাই তার বক্তব্য আমরা এই মহান সংসদে শুনতে পারি না।
সংসদকে ফ্যাসিবাদ ও তার দোসরমুক্ত দেখতে চান নাহিদ: ভাষণ দিতে গিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সংসদকে ফ্যাসিবাদ ও দোসরমুক্ত রাখার দাবি জানান বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন সংসদকে দোসরদের হাত থেকে মুক্ত রাখতে হবে। কারণ এই সংসদ শহিদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। জুলাই গণহত্যার বিচার এবং বিগত সরকারের আমলে হওয়া গুম, খুনের কঠোর বিচার করতে হবে।
ভাষণে জিয়াকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ ও আওয়ামী লীগকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বললেন রাষ্ট্রপতি। ভাষণে রাষ্ট্রপতি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটেছে।”
তিনি বলেন, হাজারো শহিদের রক্তের ওপর দিয়ে তাবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সবার সম্মিলিত আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে ২০০১ সালের জুন মাসে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছিলো বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ঐক্যের ডাক দিলেন প্রধানমন্ত্রী : সংসদের উদ্বোধনী ভাষণে ঐক্যের ডাক দেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। তিনি বলেন, “দেশে আজ থেকে আবারও কাঙ্খিত সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছি। আমার রাজনীতি দেশ এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার রাজনীতি। এই লক্ষ্য অর্জনে আমি গণতান্ত্রিক জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা চাই। এই মহান জাতীয় সংসদে সব দলের নির্বাচিত প্রত্যেক সংসদ সদস্যের সমর্থন ও সহযোগিতা চাই। দেশ গড়তে ঐক্যের বিকল্প নেই। মহান জাতীয় সংসদকে যুক্তি তর্ক আর জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চাই।”
নতুন বাস্তবতা নাকি অতীতের প্রতিচ্ছবি: সংসদের প্রথম অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী দলের উত্তেজনা ও রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা হচ্ছে। অনেকে বলছেন, প্রথম দিনে এমন পরিস্থিতি এক ধরনের নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এটি নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন নাকি অতীতের প্রতিচ্ছবি— সে প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম একটি কার্যকর জাতীয় সংসদ। তবে আমার কাছে এ সংসদকে একটি পাপেট শো মনে হয়েছে। কারণ রাষ্ট্রপতির ভাষণের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধকে দলীয়করণ করা হয়েছে।”
যুদ্ধাপরাধীদের নামে শোক প্রস্তাব এনে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে কলঙ্কিত করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “এই বিষয়টি অসাম্প্রদায়িক ও দেশপ্রেমিক মানুষকে আশাহত করেছে।” বিরোধী দল জাতীয় সংগীতের সময় প্রথমে না দাঁড়িয়ে এক ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছে বলেও জানান সিপিবির এই নেতা। আর ওয়াকআউটের ঘটনাকেও তিনি ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ হিসেবে অভিহিত করেন। তবে এসবের দায় বিএনপিও এড়াতে পারে না বলেও জানান প্রিন্স।
সবশেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ১৫ মার্চ বেলা ১১টা পর্যন্ত সংসদের কার্যক্রম মূলতবি ঘোষণা করেন।