ইতিহাসের এক নক্ষত্রের নিরব বিদায়

এম হাফিজুল ইসলাম একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাইন নন বরং তিনি একজন সৎ ও নির্ভিক দেশ নায়োকচিত বীর ছিলেন। তার জন্ম হয় ২৬ নভেম্বর ১৯৪৮ সালে কসবা উপজেলার অন্তর্গত গুরিয়ারূপ গ্রামে। তিনি গ্রাম থেকে গ্রাজুয়েশন সমাপ্ত করে পাকিস্থান বিমান বাহিনীর ফ্লাইট সার্জেন্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেই থেকেই তাঁর জীবনের নতুন মোড় গড়ে মাফিয়া ইসলামের সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে। মাফিয়া ইসলাম কসবা থানার অর্ন্তগত রাজনগর গ্রামের বিশিষ্ট ও সম্মানিত ব্যক্তি সকলের প্রীয় ও শ্রদ্ধেয় সদ্ধার বা বিচারক খ্যাত জনাব আবদুর রশীদ ভূইয়া এবং মা মনোয়ারা বেগমের মেয়ে। সেই রশিদ ভুইয়াও ইতিহাস হয়েই আছেন এই দেশবাসির কল্যাণে জীবন দিয়ে। তিনি একজন শহীদ এবং তাঁর পরিবার শহীদ পরিবার।

চাকুরী জীবন অতিবাহিত হওয়ার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার সময় তার বিবাহিত জীবনও অহিবাহিত হচ্ছিল। এই সময়ের কিছুদিন পরই শুরু এই দেশের মুক্তিকামী জনতার আকাঙ্খার প্রতিফলন মুক্তিযুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধে তিনি তিন মাসের অগ্রীম বেতনসহ এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে চলে আসেন তাঁর নিজ গ্রামে এবং শ্বশুর বাড়িতে। সেখানে তিনি তার স্ত্রীকে নিরাপদে রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। তার মুক্তিযোদ্ধার নম্বর-০১১২০০০২৩৭৪; বেসামরিক গেজেট নং- ৬২০২; লাল মুক্তিবার্তা নং- ০২১২০৪১৬৩০  এবং বিমানবাহিনী চাকুরী নং-৭৪২১৪; বিমান বাহীনি গ্যাজেট নং- ২৩০, তিনি ২নং সেক্টরে যুদ্ধ করেন। তার মুক্তিযোদ্ধা সনদ নং- ৬৩৮৯৮ তারিখ-২১/১১/২০০৪।

এম হাফিজুল ইসলাম একজন নি:লোভ ব্যক্তি ছিলেন। যেমন দেশ স্বাধীনের পর হাতে গোনা কয়েকজন সেনা এবং বিমান ও নৌ কর্মকর্তার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু দেখা করে বলেছিলেন তোমরা কে কি চাও। সেদিন অনেকেই অনেক কিছু চেয়ে নিয়েছিলেন কিন্তু তিনি বলেছিলেন না আমার কোনকিছু লাগবেনা। আমি স্বাধীনতা ও দেশ পেয়েছি এটাই যথেষ্ঠ। সেদিন বঙ্গবন্ধু তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে বুকে আলিঙ্গন করেছিলেন। এই বিষয়ে আমি জিঙ্গেস করলে তিনি বলেন এটা লোভ আর আমি এটা করতে পারি না। জীবনে কখনো লোভ করিনি এবং করবোও না। আল্লাহ আমাকো যা দেবার তা দেবেন।

এর কিছুদিন পর বঙ্গবন্ধু আবার ডাকলো এবার দেশ গঠনে কিছু কর এবং কিভাবে কি করতে হবে তা পরিকল্পনা নিয়ে শুরু করো। তখন তিনিই প্রথম প্রস্তাব করেন বিমান বাহিনী গঠন করার জন্য। তিনি বলেন বিমান বাহিনী, নৌ বাহিনী এবং সেনা বাহিনী গঠন করে নুতন সদস্য নিয়োগ দিয়ে অভিজ্ঞ ও পুরাতনরা এদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশের কল্যাণে সামনে এগিয়ে নিবে। আর তখনই (সেদিন) থেকে বাহিনীগুলো কার্যক্রম শুরু করল। সেদিনও বঙ্গবন্ধু তাকে বড় পদ দিয়ে এগিয়ে যেতে ও নিতে বললেন। তিনি তখন বললেন সিনিয়রিটি অনুযায়ী পদ বন্টন করে এই বাহিনীগুলোকে এগিয়ে নেয়া হউক। আর হয়েছেও তাই। বঙ্গবন্ধুর একজন বিশ্বস্ত অফিসার হিসেবে তিনি নি:লোভ সাধারণ জীবন যাপন করেছেন।

মেজর জিয়ার সঙ্গেও তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তিনিই পরিকল্পনা করে জাতিসংগে মিশন শুরু করেন এবং একটানা ১৭ বছর জাতিসংঘে কর্মকান্ড পরিচালনা করে জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। জিয়াউর রহমান এবং মরহুম হাফিজুল ইসলাম দুজনই বন্ধুসুলভ। একদা বেগম খালেদা জিয়া বলেন ভাইসাব আপনি আমার বড় ছেলেকে একটু দেখেন যেন সে ভাল করতে পারে। সেই থেকে তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেখতেন। তিনি তাকে তিনবার শাসনও করেছিলেন। সেই শাসনের ফল আজ বাংলাদেশ ভোগ করছে।

মেডাম জিয়া এবং জনাব হাফিজুল ইসলাম একই সময়ে এভার কেয়ারে একই ডাক্তারের চিকিৎসায় পাশাপাশি ছিলেন। ৪র্থ তলায় সিসিইউতে ডা: শাহাবুদ্ধিন তালুকদারের তত্তাবধানে। একদিন আমি মেডাম জিয়া সম্পর্কে বললে তিনি বলেন কৈ তাইনতো আমাকে কিছু বলল না। আমি তখন বললাম তিনি লাইফ সাপোর্টে। তখন চেহারায় মলিনতা প্রকাশ করে চৃপ থাকলেন। এর কিছুদিন পর তিনিও লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। কিন্ত তিনি ফাইট করে ফিরে আসেন আর সেডাম জিয়া নেই। এই খবর শুনে তিনি দু:খ করে বলেন তাঁরও জাতির জন্য একটি বড় ভুমিকা আছে। সেই মানুষটি ধীরে ধীরে অসুস্থ্য হয়ে পড়েন এবং একদিন আমি তাকে বলি আপনার সেই শাসনের ছেলেটি আজ প্রধানমন্ত্রী। আমার ছেলেকেও শাসন করে যান। তিনি খুব খুশি হন এবং দোয়া করেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জন্য।

আজ তিনি নেই কিন্তু তার স্মৃতিগুলো রয়েছে দেশবাসির সামনে। এই মানুষটি অবসরোত্তর জীবনে ফিরে আসেন কসবায় তার গ্রামের বাড়িতে। এখানেই গড়েন নিজ আবাস এবং বাড়ির নাম দেন শাপলা হাউজ। তিনি স্ত্রী, দুই কণ্যা ও এক ছেলে এবং অসংখ গুনগ্রাহী রেখে গত ৮ মার্চ ২০২৬ইং সালে সকাল আট ঘটিকায় নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আল্লাহ তাকে বেহেস্ত নসীব করান এই কামনা করি মহান এই নি:লোভ মহৎ বীরের জন্য।

মৃত্যুর পূর্বে তিনি একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুল ও মাঠ এবং কবরস্থান তৈরী করে যান মানুষের প্রয়োজনের যোগানের জন্য। এবং তিনি সেই কবরস্থানেই অতি সাধারণের সহিত সমাহিত হন। রাজনগরের সেই স্মৃতিময় স্থানেই দ্বিতীয় জানাজা শেষে সমাহিত হন। আজ তিনি অতীত এবং তাঁর স্মৃতি ও কৃতকর্মগুলো জাগরিত ও মুখরীত। আসুন এই সৎ মানুষের জীবন থেকে শিক্ষা নিই। তাঁর সততা এবং নিয়মানুবর্তীতা এবং মুখের কথার হ্যা হ্যা—-ই এবং না না—ই ছিল সমাজের জন্য ব্যতিক্রম দৃষ্টান্ত। তিনি গোপন দানবীর এবং পরোপকারী। যা মহান সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা এবং আদেশ। এই বীরের কর্মগাথা কাহিনী লিখে শেষ করা যাবে না বরং দোয়া কামনা করে এখানেই শেষ করলাম। মহান আল্লাহর খাস মেহমান হিসেবে তিনি সেখানে মহান রবের সান্নিধ্যে থাকুক…আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.