সরকার একমুখী না সমন্বিত শিক্ষা বাস্তবায়ন করবে?

প্রশান্তি ডেক্স ॥  একটি দেশে নানা ধরনের মানুষ বাস করে। মানুষে মানুষে পার্থক্য থাকে ভাষায়, জাতিতে, সংস্কৃতিতে, ধর্মে। পার্থক্য থাকে শারীরিক কাঠামোয়, মানসিক চেতনায়। জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের সময় এগুলোসহ সব ধরনের বৈচিত্র্যকেই বিবেচনায় রাখতে হয়। এমনকি, শিক্ষাক্রম তৈরি এবং পাঠ্যপুস্তক রচনার ক্ষেত্রেও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য।

আমাদের দেশে সরকারিভাবে ত্রিমাত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে, তা ভেঙ্গ একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশের বাস্তবায়ন কি সম্ভব? অবশ্য, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা করার কথা বলেছেন। তিনি সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা করার বিষয়টিও কঠিন বলে উল্লেখ করেছেন। আর কওমি শিক্ষাকেও কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায় সে বিষয়টি নিয়েও কাজ করতে চান মন্ত্রী।

সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাশের বর্তমান বাস্তবতায় কঠিন বলে জানিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সব ধারার শিক্ষাকে এক করা সম্ভব নয়। তবে, সব ধারাকে একটি ছাতার নিচে আনা উচিত। তা করতে হবে রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে। এর কোনও বিকল্প নেই। যদিও কওমি ধারাকে সংযুক্ত করা সবচেয়ে কঠিন কাজ।

গত ১৫ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ শিক্ষামন্ত্রীর কাছে জানতে চান, ইনক্লুসিভ শিক্ষা ব্যবস্থা করা হবে কি না। এ প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “আমাদের থ্রি ডাইমেনশনাল যে শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে (সাধারণ, ধর্মীয় এবং ইংরেজি মাধ্যম) সেটা সম্মন্বিত করা জটিল বিষয়। ইবতেদায়ি রয়েছে, মাদ্রাসা রয়েছে, কওমি রয়েছে, ইংলিশ মিাডিয়াম রয়েছে, সবগুলোকে সমন্বিত করা একটি জটিল বিষয়।”

তিনি আরও বলেন, “ইংলিশ মিডিয়াম নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে কমিটি করেছি। কওমি শিক্ষা ব্যবস্থাকে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায় তা নিয়ে আমরা ব্যাপক কাজ শুরু করেছি। কারণ, একটি দেশে বিভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা না থেকে কীভাবে তা সমন্বিত করা যায় সে ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে প্রচেষ্টা এবং উদ্যোগ আমরা নিচ্ছি।”

সম্পূর্ণরূূপে সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে কওমি শিক্ষা ধারা। ২০২২ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে কওমি মাদরাসাগুলোতে। বিগত বছরগুলোতে এ সংখ্যা বেড়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও। সাম্প্রতিক একটি গবেষণা ও রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ১৭ থেকে ২০ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে কওমি ধারার শিক্ষায়। তবে, এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

কওমি শিক্ষাকে মূল ধারায় আনতে বিগত আওয়মী লীগ সরকার উদ্যোগ নিলেও তা সফল হয়নি। তবে, দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমানের মান দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ শিক্ষা ধারার মধ্যে প্রধান দুটি ধারা সাধারণ ও কারিগরি। এ দুই ধারাতেই বাধ্যতামূলক বিষয় এক, ঐচ্ছিক বিষয় আলাদা। সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন মাদরাসা শিক্ষা ধারার মধ্যে রয়েছে সাধারণ শিক্ষার বিষয় এবং মাদরাসা ঐচ্ছিক বিষয়।

সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রথমিক শিক্ষা ধারার মধ্যে রয়েছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ইবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষা (প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি)। শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক বিষয়গুলো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ইবতেদায়ি মাদ্রাসয় এক। তবে, ঐচ্ছিক বিষয় আলাদা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ, কারিগরি, সরকার নিয়ন্ত্রিত মাদরাসা এবং ইবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষার এ ব্যবস্থাকে একীভূত করার সুযোগ নেই। সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা বলারও সুযোগ নেই। তবে, এ ধারাগুলোকে রেগুলেট করার ব্যবস্থা সরকারে আছে। ইংরেজি মাধ্যম সরকারের কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কওমি মাদরাসা একেবারেই নেই। ফলে শিক্ষার সব ধারাকে একটি ছাতার নিচে এনে রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কে রাখতে হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, “এতো বছরে ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন করতে পারেনি কোনও সরকার। এর ফলে একীভূত শিক্ষার বদলে নানা ধারা-উপধারায় বিভক্ত হয়ে গেছে। বিদ্যমান বাস্তবতার জায়গা থেকে যদি দেখতে হয়, তাহলে দেখতে হবে ফ্রিডম অব চয়েস। আমার সন্তানকে কোথায় দেবো সেটা আমার ইচ্ছা। আমি যদি মাদরাসা কিংবা ইংরেজি মাধ্যমে দেয়, আপনি আমাকে না করতে পারেন না। পৃথিবীর সব জায়গায় আছে।”

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে যেটা নেই সেটা হলো, কোনও ধরনের নিয়ন্ত্রণের ফ্রেমওয়ার্ক। আমি নিয়ন্ত্রণ বলবো না, বেসরকারি খাতকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনও প্রয়োজন নেই। তবে, একটা নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সবগুলো ব্যবস্থা বা ধারাকে রাখা প্রয়োজন। সম্ভবত শিক্ষামন্ত্রী সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন।”

রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, “একীভূত বলার চেয়ে বলা দরকার সমন্বিত কিংবা নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনা। কারিকুলাম (শিক্ষাক্রম) ও সিলেবাস (পাঠ্যসূচি) একই স্ট্যান্ডার্ডের হতে হবে। পঠন-পাঠনের মান একই রকম হতে হবে। সবাইকে (সব ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে) রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনতে হবে, সেটা কওমি কিংবা কিন্ডারগার্টেন হোক। কারণ, আমার দেশের সন্তানেরা কী পড়ছে, কোথায় পড়ছে, কী শেখানো হচ্ছে, যারা শেখাচ্ছেন তার আয়ের উৎস কী এগুলো আমাদের জানা থাকতে হবে। এটা আমাদের নাগরিক অধিকার। আর তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থায় থাকবে।”

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “সেগুলো সবগুলো তো একটি আইনে চলে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রেগুলেট করার জন্য ইউজিসি রয়েছে। কিন্তু, নানা ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা রেগুলেট করার কোনও কাঠামো তো আমাদের নেই। একটি ধারায় শিক্ষাকে আনা এ মুহূর্তে বাস্তবতা নয়। কিন্তু, যেখানে পড়ানো হচ্ছে সেটার যেন স্ট্যান্ডার্ডটা থাকে।”

প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় সংস্কার, গুণগত পরিবর্তন এবং মানোন্নয়নে গঠিত পরামর্শক কমিটির সভাপতি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, “অন্তর্ভুক্তি ভিন্ন বিষয়, প্রতিবন্ধীসহ সব ধরনের শিক্ষার্থীকে নিয়ে আসার বিষয়। একীভূত, ইউনিফরম, একই রকম শিক্ষা কোনও দেশেই হয় না। পৃথিবীর কোনও দেশেই নেই। কিন্তু, কিছু জিনিস কোর কারিকুলামটা কমন থাকতে হবে। ভাষা, গণিত, বিজ্ঞান এসব কিছু বিষয় কমন থাকতে হবে, যাতে সব ধারার শিক্ষার্থীরা সমানভাবে শিখতে পারে। ইংরেজি মিডিয়াম যদি হয় সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইতিহাস সংস্কৃতি জানার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাংলা ভাষা শেখার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এটা একটা নিয়মনীতি, কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। এটা নিয়ে পরিপত্রও আছে কিন্তু কার্যযকর করার ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এখন যেহেতু বলা হচ্ছে দেখা যাক কীভাবে তারা করেন।”

কওমি শিক্ষাকে রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, “মনে হয়, কওমি আনা সম্ভব নয়। তারা তো সরকারি সহায়তা ও নিয়ন্ত্রণ চায় না। কিন্তু, সরকারের একটা দায়িত্ব থাকে, সকল শিশুর যাতে নিরাপদ থাকে, কোনও ক্ষতি না হয়। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার কনভেনশন আমরা (বাংলাদেশ) মানি। শিশু নীতি আছে, সে অনুসারে শিশুরা যাতে নিরাপদ থাকে এবং কোনও রকমের ক্ষতি না হয় তা দেখার দায়িত্ব সরকারের রয়েছে। সেটা কীভাবে দেখবে, তাদের নিজম্ব বোর্ড আছে, তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিয়মের মধ্যে আনা দরকার। জোর করেও চাপানো যাবে না। অনেক লোক সেরকম শিক্ষা চাই, এমন দাবিও রয়েছে। তাই আলোচনার মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তে আসা দরকার।”

শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, “বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাধারণ, ধর্মভিত্তিক ও ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা— এ তিনটি ধারা এখন একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এদের যেকোনও একটি ধারা বন্ধ করার চেষ্টা বাস্তবসম্মত বা সমীচীন হবে না। বরং, প্রয়োজন একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে কারিকুলাম পরিমার্জনের মাধ্যমে এ বহুধারার মধ্যে একটি অভিন্ন ভিত্তি গড়ে তোলা যায়। এ লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে শিক্ষার্থীর বয়স ও স্তর অনুযায়ী একটি কোর কারিকুলাম নির্ধারণ করা জরুরি, যা সকল ধারার শিক্ষার্থীর জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হবে। পাশাপাশি প্রতিটি ধারার স্বতন্ত্র, প্রয়োজন ও বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় রেখে অতিরিক্ত বা বিশেষায়িত বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে শিক্ষার বৈচিত্র অক্ষুন্ন রেখেই একটি অভিন্ন মানদন্ড নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।”

তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করা, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা, ভাষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি সচেতনতা সৃষ্টি করা। একইসঙ্গে মাতৃভাষাসহ দেশিয় ও বিদেশি ভাষায় যোগাযোগ দক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, গণিত দক্ষতা, প্রকৌশল ও কারিগরি জ্ঞানে পারদর্শিতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষা যেন কেবল জ্ঞানার্জনে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীদের কর্মজগতে প্রবেশের উপযোগী করে তোলে এবং শোভন ও উৎপাদনশীল কাজে অংশগ্রহণে সক্ষম করে, সেই দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে, সাধারণ শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি মাদরাসা বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার কারিকুলাম পরিবর্তন, শিক্ষণ-শিখণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পরিমার্জন ও জবাবদিহি কাঠামো পুনঃবিবেচনা করা প্রয়োজন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published.