ইরান-মার্কিন আলোচনায় যুদ্ধ থামাবে কি?

প্রশান্তি আন্তর্জাতিক ডেক্স ॥ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান বিধ্বংসী যুদ্ধ বন্ধে একটি কূটনৈতিক চুক্তির সম্ভাবনা বর্তমানে খুবই ক্ষীণ বলে মনে হচ্ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি উভয় পক্ষ আন্তরিকভাবে চায়, তবে এখনও একটি সমঝোতার পথ খোলা আছে। তুরস্ক, মিসর এবং পাকিস্থানের মধ্যস্থতাকারীরা চলতি সপ্তাহেই উভয় দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি বৈঠকের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার রাজনৈতিক মিত্ররা আলোচনার ব্যাপারে উৎসাহ দেখালেও মাঠের বাস্তবতা বেশ জটিল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানিয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি গত বুধবার সন্ধ্যায় সাফ জানিয়েছেন, তেহরানের আলোচনার কোনও ইচ্ছা নেই। তবে আরব মধ্যস্থতাকারীদের দাবি, তেহরান আলোচনার ব্যাপারে আগের চেয়ে কিছুটা নমনীয়। অন্তত দুই পক্ষ যাতে মুখোমুখি বসতে পারে, এমন কিছু শর্ত তৈরির চেষ্টা চলছে।

আলোচনার পথ কতটা কণ্টকাকীর্ণ, তার একটি বড় প্রমাণ হলো, মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, আরাঘচি এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফকে চার-পাঁচ দিনের জন্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হত্যা তালিকা থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। মূলত আলোচনায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ।

যুদ্ধের আগে যেসব দাবি টেবিলে ছিল, বর্তমানে দুই পক্ষই তার চেয়ে অনেক কঠিন শর্ত জুড়ে দিচ্ছে। তেহরান এখন যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ এবং ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে মাশুল আদায়ের অধিকারও চাইছে তারা। ওয়াশিংটন চায় ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করুক। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করা, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিলিশিয়াদের সমর্থন বন্ধের দাবি জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যা ইরান বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

আলোচনার আবহ থাকলেও সংঘাত থামেনি। ট্রাম্প ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলে পদাতিক সেনা পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে গালিবাফ বুধবার সতর্ক করেছেন যে, ইরানের একটি দ্বীপে আগ্রাসনের পরিকল্পনা তারা শনাক্ত করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই কাজে কোনও আরব দেশ সহায়তা করলে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক পরিচালক মাইকেল সিং মনে করেন, একটি ন্যূনতম যুদ্ধবিরতি হতে পারে, যা পরবর্তীতে বড় আলোচনার পথ তৈরি করবে। তিনি বলেন, ‘হয়তো যুক্তরাষ্ট্র তার সব লক্ষ্য অর্জনে জেদ ধরে থাকবে, তবে এটিও সম্ভব যে একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর বিস্তারিত আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হবে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, ফেব্রুয়ারির আলোচনায় উঠে আসা কিছু প্রস্তাব এখন কাজে লাগতে পারে। যেমন, কয়েক বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখা এবং আঞ্চলিক অনাক্রমণ চুক্তির বিনিময়ে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ-এর ইরান প্রোগ্রামের পরিচালক রাজ জিমত বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে ইরান একটি যুদ্ধবিরতি চায়, তবে যেকোনও মূল্যে নয়। অন্তত তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আর কোনও হামলা হবে না, এমন গ্যারান্টি চাইবে।’ তার মতে, সবকিছু এখন ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করছে। তিনি হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হবেন কি না।

অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, চরম বৈরিতার মধ্যেও দুই দেশ অনেক সময় জটিল বিষয়গুলো একপাশে সরিয়ে রেখে সমঝোতায় পৌঁছেছে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতেও অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল, কিন্তু তা আলোচনাকে থামিয়ে দেয়নি। আটলান্টিক কাউন্সিলের ফেলো এবং ইসরায়েলে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শাপিরো বলেন, ‘যুদ্ধগুলো সাধারণত অগোছালোভাবে শেষ হয়। যদি যন্ত্রণার মাত্রা সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যায়, তবে উভয় পক্ষই একটি অসম্পূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়।’

শাপিরোর মতে, একটি সম্ভাব্য চুক্তি হতে পারে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার মাধ্যমে। পারমাণবিক উপাদান বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো পরবর্তী সময়ের জন্য তুলে রাখা হতে পারে। বিনিময়ে ইরান হয়তো আংশিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাবে। তবে এমন শান্তি হবে খুবই ভংগুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published.