প্রশান্তি ডেক্স ॥ সরকারের পক্ষ থেকে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন কবে নাগাদ হবে, এ বিষয়টি চূড়ান্ত না হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সরকারের বরাদ্দ ৪০ হাজার কোটি টাকা অন্য খাতে খরচ করা হয়েছে এমন প্রপাগান্ডা কর্মচারীদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে পুঁজি করে প্রশাসনকে অস্থির করার পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ইস্যুতে সরকারের শীর্ষ প্রশাসনিক দফতর বাংলাদেশ সচিবালয়, বিভাগীয় কমিশনারের দফতর, জেলা প্রশাসকের দফতর ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দফতর থেকে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। সচিবালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানিয়েছে, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে সচিবালয়ের অভ্যন্তরে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভের মাধ্যমে প্রশাসনকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে সরকার ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করলেও, কর্মচারীরা দ্রুত বাস্তবায়নের প্রজ্ঞাপন চাইছেন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহল থেকে প্রচার করা হচ্ছে পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সরকারের বরাদ্দকৃত ৪০ হাজার কোটি টাকার একটি বড় অংশ ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, জ্বালানি তেলের ভর্তুকি বাবদ খরচ করা হয়েছে। ৪০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে এখন সরকারের হাতে আছে মাত্র ৯৫০ কোটি টাকা।
সরকারি কর্মচারীরা দাবি করেছেন, পে-স্কেল তাদের সাংবিধানিক অধিকার, অথচ তা বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় প্রশাসনকে অস্থিতিশীল করছে। অপরদিকে, সরকার বাজেট ঘাটতি ও উন্নয়ন প্রকল্পের চাপের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিগত কয়েক বছর নতুন পে-স্কেল না হওয়া এবং নবম পে-কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ প্রশাসনের জন্য অস্থিরতার প্রধান কারণ। অর্থ সংকটের কারণে সরকার বেতন বাড়াতে দ্বিধাগ্রস্ত, যা কর্মচারীদের মধ্যে প্রতারিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি করেছে।
সূত্র জানায়, পে-স্কেল ইস্যুতে প্রশাসনের অস্থিরতার মূল কারণগুলো হলো ১. তীব্র অর্থনৈতিক অসন্তোষ: দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ২. নবম পে-কমিশন বাস্তবায়নে বিলম্ব: সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের ব্যানারে আন্দোলন হলেও, সরকার নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশে বিলম্ব করছে, যা ‘প্রতারণা’ বলে মনে করছেন অনেকে। ৩. অর্থসংকট ও বাজেট সীমাবদ্ধতা: প্রস্তাবিত পে-স্কেল বাস্তবায়নে একলাখ কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন, যা বর্তমান ভংগুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ৪. আন্দোলনের আলটিমেটাম: অবিলম্বে গেজেট না হলে কঠোর কর্মসূচি বা কর্মবিরতির আলটিমেটাম দেওয়া যায় কিনা, তা নিয়ে ভাবছেন কর্মচারী নেতারা। যা প্রশাসনিক অচলবস্থার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ৫. রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ধোঁয়াশা: নতুন সরকার নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধীরে আগানোর সিদ্ধান্ত কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়িয়েছে। মূলত, তাদের মতে, ন্যায্য দাবি না মেটানো এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে তৈরি হওয়া হতাশা প্রশাসনের কর্মদক্ষতা ও জনসেবাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
সূত্র জানান, আগামী ২০২৬-২৭ নতুন অর্থবছর প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের কথা বললেও বাস্তবে সেটা কতখানি সম্ভব হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। কেননা, সরকারের মধ্যে অর্থ সংকট আরও বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপ এখনও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য সংকট যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। তবে পে-স্কেল ইস্যু নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ুক, এমন পরিস্থিতি তৈরিও করতে চায় না সরকার। ইতোমধ্যে প্রস্তাবিত পে-স্কেল রিভিউও করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে দেশে আর্থিক সংকট আরও বেড়েছে। এ যুদ্ধ কতটা দীর্ঘায়িত হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। যুদ্ধ যতটা দীর্ঘায়িত হবে সংকট ততই বাড়বে। এমনিতেই অর্থবছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকার ওপরে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেহেতু বলেছেন, তাই সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন এই বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হতে পারে। তবে এখনই সব বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এজন্য কিছুটা সময় নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। সম্প্রতি সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন পিকেএসএফ ও পে কমিশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান। যদিও শিডিউলে দেওয়া তথ্য বলছে, তিনি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন পিকেএসএফের চেয়ারম্যান হিসেবে। তবে বৈঠকে পে কমিশনের প্রতিবেদন ও সুপারিশ বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইতোমধ্যেই সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “পে-স্কেলের সুপারিশ আমাদের দেখতে হবে। না দেখে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবো না। আমাদের দেখতে হবে, মোট অ্যামাউন্ট কত লাগবে। এটা কতটুকু বাস্তবায়ন করা সম্ভব সেগুলো দেখতে হবে। বর্তমান আর্থিক অবস্থায় যেখানে বাংলাদেশের ট্যাক্স রেভিনিউ, ট্যাক্স জিডিপি রেশিও সবচেয়ে খারাপ, এমনকি দক্ষিণ এশিয়াতে সবচেয়ে খারাপ। এসব দেখে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কতটুকু কখন কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। সেটা আমরা পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখবো।”
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতা খাতের জন্য সংরক্ষিত ৪০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৯ হাজার ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ও দাম বৃদ্ধির কারণে সরকারকে তেল, এলএনজি এবং এলপিজি আমদানিতে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। একইসঙ্গে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষকদের ঋণ সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্যও নতুন বরাদ্দের প্রয়োজন দেখা দেয়।
অর্থ বিভাগ জানায়, সংরক্ষিত অর্থ থেকে জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে ভর্তুকি হিসেবে ২৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের সুদ-আসল পরিশোধে সহায়তার জন্য ১৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা দিতে পরিবারের একজন নারী সদস্যকে মাসিক আড়াই হাজার টাকা করে দেওয়ার লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে এ কর্মসূচির জন্য ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এসব খাতে অর্থ বরাদ্দের ফলে বেতন কমিশনের জন্য সংরক্ষিত অর্থের প্রায় পুরোটা ব্যয় হয়ে গেছে। হিসাব অনুযায়ী, ৪০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে এখনও পর্যন্ত ৩৯ হাজার ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৯৬১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে নতুন জাতীয় বেতন কমিশন বাস্তবায়নের মতো বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও বাসাভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলারের বিনিময় হার ও আমদানি ব্যয়ের চাপ মূল্যস্ফীতি বাড়ার অন্যতম কারণ। নতুন পে-স্কেল এই কারণকে আরেক ধাপ এগিয়ে দেবে।
জানতে চাইলে, গাজীপুর জেলা প্রশাসনের কর্মচারী আকবর হোসেন বলেন, ‘‘আমরা হতাশ। দ্রব্যমূল্য যে হারে বাড়ছে, সে হারে বেতন বাড়েনি। নতুন পে-কমিশন গঠনে আমরা চোখে-মুখে আলো দেখতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু এখন রীতিমতো হতাশ ও ক্ষুব্ধ।’’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের মহাসচিব নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘‘সব কিছু যখন চূড়ান্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে বরাদ্দকৃত অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করার সংবাদটি আমাদের আঘাত করেছে। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে আমরা রীতিমতো হতাশ। সাধারণ কর্মচারীরা অনেকটাই ক্ষুব্ধ বলে জেনেছি।’’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমরা নিজেরা আলাপ-আলোচনা করে করণীয় ঠিক করবো। আমরা ভাবছি, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে আমাদের পক্ষ থেকে নতুন সরকারকে তাগাদা দেবো। আমরা এর জন্য কৌশল ঠিক করবো।’’