প্রশান্তি আন্তর্জাতিক ডেক্স ॥ শিশু যৌন নিপীড়ন মামলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি জুরি বোর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্ট মেটাকে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার) জরিমানার নির্দেশ দিয়েছে। অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করেছে এবং শিশু যৌন শোষণসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর কার্যক্রম ঘটতে দিয়েছে। এটিই প্রথম কোনও জুরি ট্রায়াল যেখানে প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত অপরাধের জন্য মেটাকে দায়ী করা হলো।

নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজ এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ বলে উল্লেখ করে বলেন, মেটা তাদের মুনাফাকে শিশুদের নিরাপত্তার চেয়ে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কোম্পানির কর্মকর্তারা জানতেন যে তাদের পণ্য শিশুদের ক্ষতি করছে, তবুও সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে জনসাধারণকে ভুল তথ্য দিয়েছে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে টোরেজের দপ্তর এই মামলা দায়ের করে। এর আগে ২০২৩ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখানো হয়, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম শিশু পাচার ও যৌন শোষণের একটি বাজারে পরিণত হয়েছিল, যা মামলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
জুরি প্রতি লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ ৫,০০০ ডলার জরিমানা নির্ধারণ করে মোট ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা আরোপ করে। তারা নিউ মেক্সিকোর ভোক্তা সুরক্ষা আইনের দুটি অভিযোগেই মেটাকে দোষী সাব্যস্ত করে।
তবে মেটা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে। কোম্পানির এক মুখপাত্র বলেন, আমরা এই রায়ের সঙ্গে একমত নই এবং আপিল করব। আমরা আমাদের প্ল্যাটফর্মকে নিরাপদ রাখতে কাজ করে যাচ্ছি।
বিচার চলাকালে উপস্থাপিত প্রমাণে দেখা যায়, কোম্পানির অভ্যন্তরীণ কর্মী এবং শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বারবার প্ল্যাটফর্মে ঝুঁকি ও ক্ষতিকর পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এছাড়া ২০২৪ সালে ‘অপারেশন মেটাফাইল’ নামে একটি অভিযানে তিন ব্যক্তির গ্রেপ্তারের তথ্যও তুলে ধরা হয়, যারা মেটার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে শিশুদের টার্গেট করছিল।
আদালতে আরও বলা হয়, মেটার ২০২৩ সালে ফেসবুক মেসেঞ্জারে এনক্রিপশন চালুর ফলে অনেক অপরাধের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে।
আগামী ৪ মে থেকে মামলার পরবর্তী ধাপ শুরু হবে। এতে আরও আর্থিক জরিমানা এবং প্ল্যাটফর্মে শিশুদের নিরাপত্তা জোরদারে বাধ্যতামূলক পরিবর্তনের দাবি জানানো হবে। এর মধ্যে বয়স যাচাই ব্যবস্থা কার্যকর করা, অপরাধীদের অপসারণ এবং এনক্রিপ্টেড যোগাযোগে নিয়ন্ত্রণ আরোপের মতো পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিচারে দেওয়া ভিডিও জবানবন্দিতে মার্ক জুকারবার্গ এবং অ্যাডাম মোসেরি বলেন, বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তির কারণে কিছু ক্ষতিকর ঘটনা ‘অপরিহার্য’। তবে তারা দাবি করেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোম্পানি বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ধারা ২৩০ আইনের অধীনে সাধারণত প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীদের তৈরি কনটেন্টের জন্য দায়মুক্তি পেয়ে থাকে। তবে এই মামলায় বিচারক সেই সুরক্ষা প্রযোজ্য নয় বলে রায় দেন, কারণ অভিযোগটি প্ল্যাটফর্মের নকশা ও অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এদিকে, মেটার বিরুদ্ধে লস এঞ্জেলেসে আরেকটি মামলাও চলছে, যেখানে শতাধিক পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করেছে যে, মেটা, স্ন্যাপ, টিকটক এবং ইউটিউব ইচ্ছাকৃতভাবে আসক্তিকর প্ল্যাটফর্ম ডিজাইন করে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করেছে।
এই রায় ভবিষ্যতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও আইনি চাপ আরও বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান