হরমুজ প্রণালি নিয়ে অনিশ্চয়তায় উপসাগরীয় দেশগুলো

প্রশান্তি আন্তর্জাতিক ডেক্স॥ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে দীর্ঘ এক মাসের সংঘাত শেষে উপসাগরীয় অঞ্চলে স্বস্তির নিশ্বাস ফিরলেও কাটছে না আশঙ্কার মেঘ। গত বুধবার ভোরে এই চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ এ অঞ্চলের দেশগুলো এখনও গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার এবং একটি ‘পুরোনো সভ্যতা’ ধ্বংস করার হুমকি দিয়ে সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র ৯০ মিনিট আগে এই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল। উল্লেখ্য, বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। দুই সপ্তাহের এই বিরতির প্রধান শর্তই হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা।

যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানালেও উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট জিসিসি স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছে। তাদের প্রধান ভয় হলো, দ্রুত রাজনৈতিক বিজয় পেতে ট্রাম্প হয়তো হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের আংশিক নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে পারেন। সৌদি আরবভিত্তিক গবেষক হিশাম আলঘান্নাম বলেন, ‘এটি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একটি দুঃস্বপ্ন হতে পারে। ইরান যদি এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ হাতে রাখে, তবে তারা ভবিষ্যতে যেকোনও সময় অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল করার সুযোগ পাবে।’

গত বুধবার সকালে ট্রাম্প একটি বিতর্কিত প্রস্তাব দিয়ে বসেন। তিনি জানান, হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যৌথভাবে মাশুল আদায়ের ব্যবস্থা করতে পারে। হোয়াইট হাউজ পরে জানায়, এটি কেবল একটি প্রাথমিক ধারণা; বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হলো কোনও বাধা ছাড়াই জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা।

যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে যে তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার ৯০ শতাংশ ধ্বংস করেছে। কিন্তু যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই বুধবার সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা এখনও নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম। বাহরাইন ও আমিরাত হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে যে তাদের ধৈর্যের সীমা ‘সীমাহীন’ নয়।

এর আগে গত মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বাহরাইন সমর্থিত একটি প্রস্তাবের ওপর রাশিয়া ও চীন ভেটো দেয়। ওই প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে সামরিক পাহারার কথা বলা হয়েছিল। জাতিসংঘে আমিরাতের প্রতিনিধি মোহাম্মদ আবুশাহাব বলেন, ‘কোনও দেশেরই বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনী বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা থাকা উচিত নয়। হরমুজ প্রণালি ইরানের দরকষাকষির ঘুঁটি হতে পারে না।’

উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি, বিশেষ করে পর্যটন ও অর্থনৈতিক খাত এই যুদ্ধে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হামাদ আলথুনায়ায়ান বলেন, ‘ইরান যদি আগ্রাসন চালিয়ে যায়, তবে উপসাগরীয় দেশগুলো সব পথ খোলা রাখবে। যেকোনও চুক্তিতে আমাদের স্বার্থের প্রতিফলন থাকতে হবে।’

হরমুজ নিয়ে আলোচনা চললেও ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা। ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কিছুটা কমানোর প্রস্তাব দিলেও তা পুরোপুরি বন্ধ করতে নারাজ। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘ইরানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের বিষয়ে প্রেসিডেন্টের অবস্থানে কোনও পরিবর্তন হয়নি।’ ফলে ইসলামাবাদের আসন্ন বৈঠক থেকে স্থায়ী কোনও সমাধান আসবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়ে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.