প্রশান্তি ডেক্স॥ দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাত নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিনের। করোনা মহামারি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে স্বাস্থ্য খাতের পরিস্থিতি। তারপরও এই খাতে নেই তেমন অগ্রগতি। লোকবল সংকট, প্রয়োজনের তুলনায় কম বরাদ্দ, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা, সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির অভাব, চিকিৎসায় অতিরিক্ত ব্যয় ও ওষুধের দাম-সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ধুঁকছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতে যে মহাপরিকল্পনা দরকার তার যথেষ্ট অভাব আছে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হলে তাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা অত্যন্ত জরুরি।

বাজেটের বরাদ্দ যায় কোথায় : বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দ জিডিপি’র ১ শতাংশেরও কম। তার বেশিরভাগই খরচ হয় বেতন ভাতায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাজেটের অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখার কথা বললেও তা আদৌ করা যায়নি। অন্তবর্তী সরকারের আমলে স্বাস্থ্য খাত হয়েছিল স্থবির, তেমন কোনও অগ্রগতি এই খাতে বাস্তবায়ন করেনি। বিএনপি সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি আছে, তবে বাস্তবায়ন করা চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ স্বাস্থ্য খাতে খরচ করা হবে। স্বাস্থ্য খাতে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে গণতান্ত্রিক এই সরকার কাজ করবে। সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা হবে।
স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন তাদের সুপারিশে বলেছে, জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ বরাদ্দ স্বাস্থ্য খাতে থাকা উচিত। কিন্তু অন্তবর্তী সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রেখেছে জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘‘আমাদের দেশে গত একযুগেরও বেশি সময় ধরে স্বাস্থ্য খাতে যে বাজেট দেয়াও হয়, সেটা জিডিপির এক শতাংশের মতো। কিন্তু বর্তমান সরকার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে বলেছে তারা জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেবে। এখন জিডিপির এক শতাংশের কম অর্থ যেটি বরাদ্দ দেওয়া হয়, সেটাকেই তো কাজে লাগানোর সামর্থ্য আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অথবা বিভাগের নাই। তাহলে সেই সামর্থ্যটা বাড়ানোর জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতরকে নতুন করে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। সেটি করার কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
একজন চিকিৎসকের রোগী কয়জন : দেশে প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র দশমিক ৮৩ জন। রোগী দেখেন এমন চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার। বাংলাদেশে জনসংখ্যা ও চিকিৎসকের এ অনুপাত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। নার্সের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দেশে মোট জনসংখ্যার বিপরীতে ৩ লাখ ১০ হাজার ৫০০ নার্স থাকা দরকার। কিন্তু কর্মরত আছেন মাত্র ৫৬ হাজার ৭৩৪ জন, অর্থাৎ মোট চাহিদার মাত্র ২৮ শতাংশ।
চিকিৎসক ও নার্স সংকট দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ চিকিৎসক ও নার্স না থাকায় যথাযথ সেবা প্রদান ব্যাহত হচ্ছে এবং রোগীর চাপ বাড়ছে। ফলে রোগীকে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হচ্ছে। প্রয়োজনের তুলনায় কম চিকিৎসক থাকায় অতিরিক্ত রোগী দেখতে হচ্ছে একজন চিকিৎসককে। অপরদিকে নার্স সংকট রোগীর পরিচর্যা ও সেবার মানকে প্রভাবিত করছে। সেবার গুণগত মান হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে উপজেলা ও গ্রামীণ পর্যায়ে এ সংকট আরও তীব্র। এতে করে অনেকেই বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করে বা একেবারেই চিকিৎসা না নিয়ে ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে। ফলে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে।
দেশের স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানের ঘাটতি পূরণে সরকার বড় ধরনের জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে নিয়োগের মাধ্যমে এই সংকট দূর করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘‘রোগীদের জন্য হাসপাতালের বেডের সংখ্যা হচ্ছে ১ লাখ ৭২ হাজার এর মতো। এর মধ্যে ১ লাখ বেড হচ্ছে বেসরকারি খাতে, আর ৭২ হাজারের মতো হচ্ছে সরকারি খাতে। তাহলে সরকারি খাতে দেখভালের জন্য যত জনসংখ্যা আছে, বেসরকারি খাতে নজরদারি করার জন্য, তাদেরকে কোয়ালিটি মেনটেইনের জন্য জনসংখ্যা হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন। এজন্য একটা আলাদা অধিদফতর তৈরি করা দরকার, সে ব্যাপারেও কোনও পরিকল্পনা এখনও নাই।’’
তিনি বলেন, ‘‘১৮ কোটি মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে গেলে যে এক মহাপরিকল্পনা থাকতে হবে, সেটা তো করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ হচ্ছে প্রতি এক হাজার লোকের জন্য একজন ডাক্তার থাকতে হবে। আমাদের রোগী দেখার ডাক্তারের সংখ্যা কম বেশি ৯০ হাজারের মতো, যারা রোগী দেখেন, সেই অনুপাতটাকে ঠিক করতে হবে। নার্স তো কম আছেই, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টও পর্যাপ্ত নেই।’’
চিকিৎসা ব্যয় দারিদ্র্য বাড়িয়েছে : স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালে চিকিৎসা ব্যয়ে সরকারের অংশ ছিল যথাক্রমে মোট ব্যয়ের ২৮, ২৬ ও ২৩ শতাংশ। আর ওই বছরগুলোতে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় ছিল ৬৪, ৬৬ ও ৬৯ শতাংশ। এ ব্যয় করতে গিয়ে বছরে ৮৬ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। চিকিৎসার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে ওষুধ কিনতে। এতে ব্যয় ৬৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
২০২০ সালে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের গবেষণায় দেখা গেছে, একজন ব্যক্তি স্বাস্থ্য খাতে মোট ব্যয়ের ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ নিজেই বহন করেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্য বলছে, জনপ্রতি ১০০ টাকা চিকিৎসা ব্যয়ের মধ্যে রোগীকে ৭৩ শতাংশ বহন করতে হয়। এর মধ্যে ৫৪ দশমিক ৪০ শতাংশ ওষুধে, রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ২৭ দশমিক ৫২ শতাংশ। চিকিৎসকের পেছনে ব্যয় ১০ দশমিক ৩১ এবং যাতায়াতে ব্যয় করতে হয় ৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব বলছে, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশের ৪৪ শতাংশ পরিবার আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, ‘‘স্বাস্থ্য খরচের ভার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে। অনেকেই চিকিৎসা নিতে পারেন না অর্থাভাবে। অনেকে আবার সঞ্চয় শেষ করে, ধারদেনা করে কিংবা সম্পদ বিক্রি করে চিকিৎসা ব্যয় মেটান। এ কারণেই আর্থিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়।’’
লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘‘টারশিয়ারি কেয়ারের হাসপাতাল মানে উচ্চতর স্বাস্থ্যসেবা যেগুলো, সেগুলো ঢাকা বা বড় জায়গায় কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। জেলা শহরকেন্দ্রিক আসলে টারশিয়ারি কেয়ারটা নিতে হবে। সেটা নেওয়ার জন্য আমাদের কী করতে হবে? আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।’’
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে কোনও কাজ হয়নি : অন্তবর্তী সরকারের সময়ে গঠিত স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্কার কমিশন বেশ কিছু গুরুত্ব্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছে। তবে সেগুলোর বেশিরভাগই আলোর মুখ দেখেনি। গত বছরের ৫ মে কমিশনের প্রধান জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খানের নেতৃত্বে কমিশন সদস্যরা তৎকালীন অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেন। এতে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য ৩২টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়।
প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কারের মধ্যে আছে কাঠামোগত সংস্কার, ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, বাজেট বৃদ্ধি, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তা ও ওষুধ ব্যবস্থাপনা।
সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান জানিয়েছেন, সুপারিশ করা আমাদের দায়িত্ব ছিল, বাস্তবায়ন করা সরকারের কাজ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘‘অন্তবর্তী সরকার স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কাজ করে যায়নি। যারা সংস্কারের কাজ দেখাশুনা করবেন, অন্তত একটা কমিটি করে দিতে পারতো। এখনকার সরকারেরও সেদিকে কোনও মনোযোগ নাই।’’