অর্থনৈতিক সংকটে রাজস্ব আদায়ে বড় ধাক্কা

প্রশান্তি ডেক্স॥ দেশের চলমান অর্থনৈতিক চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আমদানি ও ভোগব্যয়ে ধীরগতি এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্থবিরতার প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে পড়েছে সরকারের রাজস্ব আহরণে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকার বেশি।

এনবিআরের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪২১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আয়কর, মূসক (ভ্যাট) ও শুল্ক মিলিয়ে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের কারণে বাজারে বিক্রি কমেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভ্যাট আদায়ে। একইসঙ্গে শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছে না। এতে আয়কর ও আমদানি শুল্ক আদায়ও প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না।

তবে বড় ঘাটতির মধ্যেও রাজস্ব আদায়ে কিছুটা প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে এনবিআর। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

খাতভিত্তিক বিশ্ল্লেষণে দেখা গেছে, শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর তিনটি প্রধান উৎসের কোনোটিই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। যদিও শুল্ক খাতে ৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ, ভ্যাটে ১১ দশমিক ১ শতাংশ এবং আয়করে ১১ দশমিক ৫৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

সংশ্ল্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে আমদানি নিয়ন্ত্রণ নীতি বহাল থাকায় আমদানি নির্ভর রাজস্ব আদায়ে চাপ তৈরি হয়েছে। অপরদিকে, বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় ভ্যাট সংগ্রহে কাঙ্খিত গতি আসছে না।

এপ্রিল মাসের চিত্রও ছিল হতাশাজনক। এ মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫ হাজার ৬০৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩৯ হাজার ৬০ কোটি টাকা। যদিও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ।

এপ্রিল মাসে শুল্ক খাতে ১৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং আয়কর খাতে ১৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও ভ্যাট খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ, ভোগ ও ক্রয়ক্ষমতার দুর্বলতা এখনও রাজস্ব আদায়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

বিশ্ল্লেষকদের মতে, রাজস্ব ঘাটতির এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাজেট বাস্তবায়ন, উন্নয়ন ব্যয় এবং ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিভিন্ন শর্ত বাস্তবায়নের চাপও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.