কসবা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি ॥ কসবা উপজেলা সহ আশে পাশের উপজেলাগুলোতে শীতকালে খেজুর রস সংগ্রহ ছিল একসময়ের গ্রামীন ঐতিহ্য। কিন্তু এখন সেই রস সংগ্রহের পেছনে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে খেজুর গাছ। রস সংরক্ষণ ও অতিরিক্ত রসের লোভে অনভিজ্ঞ ও কিছু অসাধু গাছিরা নির্বিচারে গাছ কাটছে, গভীর করে চেরা দিচ্ছে। ফলে বছরের পর বছর অপ্রকৃত পদ্ধতিতে রস তোলার কারণে গাছগুলো দ্রুত মারা যাচ্ছে এবং পরিবেশ-প্রকৃতি চরম বিপাকে পড়ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত দুইুতিন বছরে এ অঞ্চলে খেজুর রস সংগ্রহ প্রক্রিয়া প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। এখনও যেখানে কিছু খেজুর গাছ টিকে আছে, সেগুলোরও সঠিক পরিচর্যার ঘাটতি রয়েছে। অনভিজ্ঞ গাছিরা রস বেশি পাওয়ার আশায় একই গাছে একাধিক গভীর চেরা দিচ্ছেন ফলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে পেশাদার গাছিদের পেশা হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ রস সংগ্রহ পদ্ধতিতে গাছের আয়ু ও কমে যাচ্ছে।
স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলছে, রস সংগ্রহের নামে যে ভাবে গাছ নিধন চলছে, তা পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। খেজুর গাছ শুধু রসের উৎস নয়; এটি মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং শীতকালে জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু প্রতিদিনই অদক্ষ হাতে গাছ কাটার কারণে সবুজায়ন কমে যাচ্ছে। এতে শীতের তাপমাত্রা পরিবর্তন, কুয়াশার মাত্রা কমা, স্থানীয় আবহাওয়ায় অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে কিছু অসাধু ইটভাটা মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তারা জ্বালানি হিসেবে খেজুর গাছ ব্যবহার করছেন, যা গাছ নিধনকে আরও ত্বরান্বিত করছে। ফলে রস সংগ্রহ তো দূরের কথা, গাছের অস্তিত্বই টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা জানান, যদি এখনই রস সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ ও সচেতনতা বৃদ্ধি না করা হয়, তবে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যেই এ অঞ্চলে খেজুর গাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে খেজুরের রস সঠিক ভাবে সংরক্ষণ না করতে পাড়াই নিশাচর পাখি ও সরীসৃপ প্রাণী অবাদে পাত্র থেকে পান করার ফলে নানান জীবানু রসের সাথে ছড়িয়ে মানবদেহের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে তাই যেন তেন গাছির রস সংরক্ষণ ও পাণ করাটা স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খেজুর গাছের বৈজ্ঞানিক পরিচর্যা এবং রস সংগ্রহের প্রশিক্ষণ ছাড়া কাউকে গাছ কাটতে দেওয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত রসের আশায় গাছ হত্যা করলে তা শুধু ঐতিহ্যের ক্ষতি নয় এটি সরাসরি জলবায়ু ও পরিবেশ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে।
গ্রামীণ জনপদের মানুষদের আক্ষেপ, রস সংরক্ষণ যাদের আয়-রোজগারের পথ খুলে দিত, আজ তাদের ভুল পদ্ধতির কারণেই গাছই হারিয়ে যাচ্ছে।” তাই এখনই কঠোর ব্যবস্থা ও যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু বই থেকেই খেজুর রসের ঐতিহ্য জানতে পারবে।