ব্রাহ্মণবড়িয়া জেলার অন্তর্গত সৈয়দাবাদ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান জনাব মোজাম্মেল হক মজনু। তিনি জনাব জহিরুল হক বি.এ সাহেবের মেজো ভাই। তাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাই গত হয়েছেন। শুধু জহিরুল হক বিএ সাহেব অবশিষ্ট রয়েছেন। সৈয়দাবাদ গ্রামের মরমালি গোষ্ট্রির সন্তান জনাব মোজাম্মেল হক মজনু। তিনি শৈশব থেকেই সাদামাটা জীবন যাপন করে পরোপকারী জীবন হিসেবে নিজেকে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য করে সার্বজনীন হয়ে উঠেছেন। তিনি আজকের এই অবস্থান একদিনে তৈরী করেননি বরং তিলে তিলে এই অবস্থান তৈরী হয়েছে। সর্বসাধারণের মনের কোণে নিজের অবস্থান তৈরী করে এক অসাধারণ জীবনের অধীকারী হয়েছেন।

তাঁর সঙ্গে এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে আমার শৈশব থেকেই বেড়ে উঠা। জনাব জহিরুল হক বিএ সাহেবের নির্বাচন এমনকি পারিবারিক বন্ধনের আবর্তনে একই পরিবার হয়ে বেড়ে উঠা। মজনু কাকা আমার অত্যান্ত প্রীয় ছিলেন। আর তিনি আমাকে তার সন্তান ভেবেই মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত প্রমান রেখে গেছেন। কাকার সঙ্গে আমার শেষ কথাগুলো এবং হাসপাতালের বেডে শুয়ে স্মৃতিচারণগুলো আমাকে সামনের দিনে হাতরিয়ে বেড়াতে সাহায্য করবে। আমি প্রথম ফেসবুকে দেখলাম কাকা অসুস্থ এবং এভার কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি। আমি ছোটভাই পাপেলকে ফোন করি এবং না পেয়ে চাচি আম্মাকে ফোন দিয়ে যোগাযোগ করি। তারপর ছোটভাই আমাকে ফোন দিয়ে বলে আমরা তৃতীয় তলায় আছি। এইভাবেই যোগাযোগ রক্ষা করা হয়েছিল। কিন্তু আমার তর সইছিলোনা। তাই সুযোগ খুজতে ছিলাম কাক্কুর সঙ্গে দেখা করার।
একদিন আমি আমার শ^শুরকে চারতলার সিসিইউতে দেখে সরাসরি তিন তলার আইসিইউতে যাই এবং দীর্ঘক্ষন কাকার সঙ্গে কথা বলি। কিন্তু কাকা আমাকে আমার ছোটভাই ভেবে বলে আমার নয়নকে দেখতে মন চাইছে এবং নয়নের বউ ও ছেলে এবং মেয়েকে দেখতে। তাদেরকে আসতে বলো। আমি তখন মুখের মাস্ক খুলে বলি কাকা চিনছেন আমাকে… তখন কাকা বলে কাছে আস। তিনি বিছানায় উঠে আমাধে জড়িয়ে ধরে। প্রথমেই বলে ছোটবেলা থেকেই তোমাদের সঙ্গে উঠাবসা ও চলাফেরা ইত্যাদি ইত্যাদি স্মৃতিচারণ এবং শেষে বলে কোন ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা করো। আমিও কাকার কাছে মাফ চেয়ে নিয়ে বলি; কাকা আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন ইনশাআল্লাহ। অনেক কথা ফাকে বলে (আমার আব্বা) ভাই সাবকে আসতে বলো। তার সাথে আমার অনেক কথা আছে। দু:খের বিষয় হলো আমি ভাবিনী কাকা আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন। আর এই কারণেই আমি আমার ছেলে ও মেয়ে এবং স্ত্রী আর বাবাকে কাকার সামনে হাজির করতে পারিনি। এটাই জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আমার কাছে দু:খ হিসেবে পিড়াদায়ক হয়ে থাকবে।
কাকার পরিবারের সাথে পরবর্তীতে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দুই পরিবার একই পরিবারে রুপ লাভ করি। শুরু থেকেই আমি কবির ভাইয়ের সাথে চলেছি এবং জীবনের আনেক সময় পার করেছি। বিপদে আপদে উভয়ে উভয়ের পাশে থেকেছি এবং আজও সেই বন্ধন আমাদের অটুট আছে। শৈশবের নষ্টাজিক স্মৃতিগুলো এখনও হাতরিয়ে বেড়ায়। দারু ভাই, বাবুল ভাই, ইসমত আরা আপা এবং দুই চাচি আমাকে যথেষ্ট আদর করতো। সকালের রুটি খাওয়া এবং চা এটা দুই চাচিই আদর করে দিতেন। পরবর্তীতে ঐ বাড়ির সকলেই আদর ও ¯েœহ করতেন। ইলেকশন এলে মামার বাড়িয়ে খাওয়াটা অসাধারণ ছিলো। কবির ভাই বলতো ওয়ার্ক শেষে দুপুরে মামার বাড়িতে খাব। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থাও হয়ে যেতো। চাচিদের কথা অনেক মনে পড়ে তাড়া যতœশীল হয়ে নিজের ছেলের মতই আদর যতœ নিতেন। রাত তিনটায় ছোটভাই স্বপনের ইলেকশনে যখন লিফলেট নিয়ে কুমিল্লা থেকে আসি তখন দুই চাচিই যতœকরে লেপদিয়ে ঘুমাতে সাহায্য করেছিলেন যা এখনও মনে পড়ে। রাত্র এবং শীত বলে বাড়িতে যেতে দেননি। নয়নতারা এবং শাহানাজ এই দুই ছোটবোন সবসময়ই ভাইয়ের খবর নিতেন। আরো কতো কি। বিশেষ করে রঙ্গু কাকার স্থির কথাও মনে পড়ে। আজ সেই দিনগুলোকে খুজে বড়ই শান্তি ও উদ্ভেলিত হই। ছোটভাই বোনদের কথাও সকল সময় মনে পড়ে। সকলের নামোল্লেখ না করে শুধুই বলব এই পরিবারটি আমারই পরিবার।
কাকার জানাজায় অগনিত মানুষের স্বতস্ফুত অংশগ্রহনই প্রমান করে কাকা সকলের। দল ও মতের উদ্ধে ছিলেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশ জাতিয়তাবাদী দল বিএনপি করতেন। শুধু তিনি নয় বরং উনাদের পরিবার এবং গোষ্টির সকল মানুষই বিএনপি। শুধু তাই নয়। মজনু কাক্কু ও জহির কাক্কু দুজনই নিজস্ব স্বকীয়তা এবং পরিচয়ে পরিচিত। তাদের পরিচয়েই বিএনপির পরিচয় এবং জাগরণ। দল মত নির্বিশেষে গ্রামের মানুষ বিএনপিকে ভোট দেয় কারণ তারা জহিরুল হক ও মোজাম্মেল হক মজনুকে ভালবাসে। আজ গ্রামে যে বিএনপির জাগরণ তার অন্যতম ও প্রধানতম কারণ এই জীবন্ত দুই কিংবদন্তি।
সকল মানুষের আহাজারি এবং আকুতি একটিই মজনু ভাই, কাকা, বিয়াই এবং অভিভাবক ও সহকর্মী এমনকি সহযোদ্ধা হিসেবে আল্লাহ যেন বেহেস্তের সর্বোচ্চ স্তরে স্থান দিয়ে তাকে সম্মানিত করেন। গ্রামের স্কুল, কলেজ, মসজিদ মাদ্রাসায় তার অবদান অনুসরনীয় এবং বিচার সালিষে তার ন্যায় পরায়নতা এবং সততা সমাজে দৃষ্টান্ত হয়ে মানুষের মনিকোঠায় উদ্ভাসিত থাকবে। সময়ে অসময়ে ফোন দিয়ে বললে সাথে সাথে কাজ শেষ করে দিতেন এবং বলতেন ভাতিজা তুমি চিন্তা কইরো না আমি আছি। আমি সব দেখব; তুমি কিন্তু বাড়িতে এলে আমাকে দেখে যাইবা, বউমা ও তোমার ছেলে-মেয়েকে নিয়া আমার বাড়িতে আসবা। বিভিন্ন ফল ও খাবার খাওয়াতেন এবং ঢাকার আনার জন্য দিয়ে দিতেন। এই অমায়িক সাদামনের সম্মানিত ও পুজনীয় মানুষটিকে হারিয়ে একপ্রকার দিশেহারাই হয়েছি। ভাষায় প্রকাশ করার মত সুযোগ থাকলেও আবেগের বশে ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। ওনার গুনকির্তন গেয়ে শেষ করা যাবে না।
নিজে অসুস্থ্য থেকেও তিনি অন্যের খোজ খবর নিয়েছেন। বিশেষ করে আমার শ^শুরের অবস্থা কি এবং কেমন আছে আর তাজু ভাই অবসরে গিয়ে কি কোন অফিসে কাজে যুক্ত হয়েছেন; আর কেমন আছেন। সময় থাকলে আসতে বলবা। এইযে কথাগুলো আর কে বলবে আমাকে। ছোট ভাইদের সমস্ত কথা বলে সন্তষ্টি প্রকাশ এবং একসঙ্গে মিলেমিশে চলার পথপ্রদর্শনও করেছেন। জার্মানীতে চিকিৎসা করাতে যাবেন। পাসপোর্ট করেছেন। ছোট ভাই ও তার পরিবার যথেষ্ট করে। তাদের টাকার কোন সমস্যা নেই, ৫ লক্ষ্য টাকা বেতন পায় ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি বললাম আমরাওতো আছি। শুতরাং আপনার কোন চিন্তা নেই। আল্লাহ আপনাকে সুস্থ্য করে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দিক এই কামনা করি।
তিনলাখপীর বাজার করা এবং বাজার মসজিদ করা এমনকি সকল কাছে কাকা আমাকে সঙ্গে রেখেছিলেন। যদিও আমি গ্রামে বেশী যায়নি তারপরও যোগাযোগ এবং কথোপকথন সবসময়ই ছিল। কিন্তু আজ আর কার সাথে কথা বলব। জহির কাকাতো সেইভাবে আর কথার পিঠে কথা বলতে পারেন না এমনকি মজনু কাকার মতো এতো সদালাপী হয়ে বুকে জড়ানোর অভিভাবক হারালাম। ছোট ভাই স্বপন এখন জহিরুল হক বিএ এবং মোজাম্মেল হক মজনু কাকার অবর্তমানের ছায়া হয়ে কাজ করবে এটাই বিশ^াস। ছোট ভাই স্বপনের মোনাজাত ও কান্নার আওয়াজ আল্লাহর আরশে গিয়ে পৌছেছে। আমরাও তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে মহান খোদা তায়ালার কাছে কাকার জন্য একই ফরিয়াদ করি। আল্লাহ আমার প্রীয় কাকাকে তোমার হাতে সমর্পন করিলাম তুমি গ্রহণ করো এবং তোমার সঙ্গে রেখ। বেহেশতের পূর্ণতা দান করো। আল্লাহ আমাদের সবাইকে মোজাম্মেল হক মজনু কাকার মত ইতিবাচক কল্যাণকামী কর্মকান্ডের কান্ডারী হিসেবে গড়ে তুলে ব্যবহার করুক এই কামনা করি। আমিন।
তাজুল ইসলাম নয়ন, সম্পাদক ও প্রকাশক সাপ্তাহিক প্রশান্তি; পরিচালক, বেঙ্গল ক্রিয়েটিভ মিডিয়া লি:; সভাপতি, সাপামা, সদস্য বেসিস ষ্ট্যান্ডিং কমিটি; উপদেষ্টা আদর্শপল্লী মসজিদ উন্নয়ন কমিটি।