প্রশান্তি ডেক্স ॥ জীবন বিমা মানে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে আর্থিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি। জীবন বিমাকে দেখা হয় নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা হিসেবেই। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা কিংবা মৃত্যুর পর পরিবার যেন আর্থিক সুরক্ষা পায় এই বিশ্বাসেই মানুষ মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কষ্টার্জিত টাকা জমা রাখেন বিমা কোম্পানিতে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই প্রতিশ্রুতিই পরিণত হয়েছে দীর্ঘ প্রতারণা ও অপেক্ষার দুঃস্বপ্নে। বছরের পর বছর প্রিমিয়াম জমা দিয়েও মৃত্যু দাবি, মেয়াদপূর্তি বা সারেন্ডার ভ্যালুর টাকা না পাওয়া এখন দেশের জীবন বিমা খাতের বাস্তব চিত্র।

বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন বলছে, দেশের অন্তত সাতটি জীবন বিমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড বর্তমানে শূন্য বা মাইনাস অবস্থায়। অথচ এসব কোম্পানির কাছেই আটকে আছে অন্তত ১৩ লাখ গ্রাহকের ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি দাবি।
কারও দাবি ঝুলে আছে পাঁচ বছর, কারও ১০ বছর। অনেক গ্রাহক এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নিজের টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। আইডিআরএ’র সেপ্টেম্বর প্রান্তিক হিসাব অনুযায়ী, ৩৬টি জীবন বিমা কোম্পানির লাইফ ফান্ডের পরিমাণ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। তবে বেশ কয়েকটি ইনস্যুরেন্স কোম্পানির লাইফ ফান্ড কার্যত নিঃশেষ। ফান্ডে টাকা না থাকায় নতুন দাবি এলেই তা পরিশোধের সক্ষমতা নেই এমন বাস্তবতা নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিবেদনেই উঠে এসেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহকরা এখন দ্বারে দ্বারে ঘুরেও টাকা পাচ্ছেন না।
আইডিআরএ’র তথ্য বলছে, লাইফ ফান্ড থেকে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করা হয়। অথচ ৯টি কোম্পানির লাইফ ফান্ড খুবই নাজুক অবস্থায়। এর মধ্যে ৭টি কোম্পানির লাইফ ফান্ডে একটি টাকাও নেই। ম্যানেজমেন্টের অব্যবস্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের লুটপাটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে লাইফ ফান্ডের ওপর। কর্মকর্তা ও মালিকরা মিলে টাকা সরাতে সরাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইফ ফান্ড একেবারে ফাঁকা করে ফেলেছেন। কোনও কোনও কোম্পানির লাইফ ফান্ড এখন ঋণাত্মক অবস্থায় চলে গেছে। ফলে মাইনাস হওয়া এই সাত কোম্পানির গ্রাহকরা আপাতত পাওনা টাকা পাচ্ছেন না।
আইডিআরএ’র তথ্য অনুযায়ী, সাত কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের লাইফ ফান্ড। মালিকদের লুটপাট ও অর্থ তছরুপের কারণে এই প্রতিষ্ঠানটির ফান্ড এখন ফাঁকা। শুধু তাই নয়, লাইফ ফান্ডের ৪৫৩ কোটি ১৫ লাখ টাকাও গিলে ফেলেছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিকরা।
জানতে চাইলে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আব্দুর রহিম ভূঁইয়া বলেন, ‘‘আগের মালিকপক্ষ লাইফ ফান্ড থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ায় কোম্পানির আর্থিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে।’’
তিনি জানান, ২০২১ সাল থেকে বড় অঙ্কের দাবি থাকা গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে সীমিত সক্ষমতার মধ্যেও ছোট অঙ্কের দাবি থাকা গ্রাহকদের ক্ষেত্রে পরিশোধ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে কোম্পানি।
তার ভাষায়, দীর্ঘদিনের এই সংকটের কারণে গ্রাহকসেবা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হলেও প্রতিষ্ঠানটি পরিস্থিতি সামাল দিতে ধীরে ধীরে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিচ্ছে।
উল্লেখ্য, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার সময় ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদে ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত ছিলেন একাধিক সাবেক পরিচালক ও কর্মকর্তা। সে সময় প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন সাবেক পরিচালক মো. হেলাল মিয়া, শাহরিয়ার খালেদ, নাজনীন হোসেন, খন্দকার মোস্তাক মাহমুদ, মো. মনোয়ার হোসেন, কে. এম. খালেদ, এম. এ. খালেক, ইফফাৎ জাহান, মো. মিজানুর রহমান, মোজাম্মেল হোসেন, রাবেয়া বেগম, মো. মোশাররফ হোসেন, কাজী ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. হেমায়েত উল্লাহ।
এ ছাড়া একই সময়ে কোম্পানির পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে আরও যুক্ত ছিলেন সৈয়দ আবদুল আজিজ, প্রকৌশলী আমির হোসেন, তাসলিমা ইসলাম, সাবিহা খালেক, সারওয়াৎ খালেদ সিমিন, মো. আজহার খান, মো. সোহেল খান, গোলাম কিবরিয়া ও এস. এম. মোর্শেদ।
লাইফ ফান্ড ফাঁকা করার তালিকার দ্বিতীয় স্থানে এসে দাঁড়িয়েছে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্স। এই প্রতিষ্ঠানটির লাইফ ফান্ডে কোনও টাকা নেই। উল্টো ফান্ডের ৩০৬ কোটি টাকা অন্য খাতে খরচ করা হয়েছে।
পদ্মা লাইফ ইনস্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আবু মুসা সিদ্দিকী বলেন, ‘‘কোম্পানির লাইফ ফান্ড বর্তমানে ঋণাত্মক হলেও সেটিই প্রধান সমস্যা নয়। প্রকৃত সংকট তৈরি হয়েছে লিকুইডিটি বা তাৎক্ষণিক নগদ অর্থের ঘাটতির কারণে।’’
তিনি জানান, কোম্পানির পর্যাপ্ত সম্পদ (অ্যাসেট) থাকলেও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সেগুলো বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এসব সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার সম্পদ বিক্রির জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেশের চলমান সংকটের কারণে প্রত্যাশিত ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।
আবু মুসা সিদ্দিকী আরও বলেন, ‘‘বর্তমানে প্রিমিয়াম আদায় থেকে যে অর্থ আসছে, সেখান থেকেই গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ করা হচ্ছে।’’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচনের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কোম্পানির আর্থিক অবস্থাও ধীরে ধীরে উন্নতি হবে।
বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্সের লাইফ ফান্ডেও কোনও টাকা নেই। এই প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকের ফান্ড থেকেই লুট করা হয়েছে অতিরিক্ত ৬৫ কোটি টাকা।
বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নূর মোহাম্মদ ভূইয়া বলেন, তিনি সদ্য প্রতিষ্ঠানটিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তার আগে দীর্ঘ সময় ধরে কোম্পানিটির সব শাখা কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে এবং এর ফলে লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক অবস্থায় চলে যায়।
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ১৬টি স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ বিমা পণ্য চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কোম্পানির কার্যক্রমে অটোমেশন জোরদার করা, অপ্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানো এবং প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের কাজ চলছে।
নূর মোহাম্মদ ভূইয়া আরও বলেন, ‘‘সব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্সকে ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে স্থিতিশীল করা এবং গ্রাহকবান্ধব একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা।’’
লাইফ ফান্ডে টাকা না থাকার তালিকায় নাম লিখিয়েছে এই সেক্টরের নতুন কোম্পানি শান্তা লাইফ ইনস্যুরেন্স। প্রতিষ্ঠানটির ফান্ড থেকে টাকা নিয়ে অন্য খাতে খরচ করা হয়েছে ১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। শান্তা লাইফ ইনস্যুরেন্সের নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নাফিস আকতার আহমেদ বলেন, ‘‘একটি নতুন জীবন বিমা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শুরুতে লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক থাকা অস্বাভাবিক নয়। সাধারণত যেকোনও নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রথম পাঁচ বছর এ ধরনের পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে। তবে শান্তা লাইফ গ্রাহকের স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে লাইফ ফান্ডকে দ্রুত ইতিবাচক অবস্থায় নেওয়ার জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’’
ফান্ডে থাকা ৫ কোটি ১১ লাখ টাকা সরিয়েছে স্বদেশ লাইফ ইন্সুরেন্স। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ কে কাওসার বলেন, ‘‘প্রতিষ্ঠানটির লাইফ ফান্ড তার যোগদানের আগ থেকেই ঋণাত্মক অবস্থায় ছিল।’’ তিনি জানান, “আমি গত আগস্ট মাসে দায়িত্ব নেওয়ার সময় স্বদেশ লাইফকে অত্যন্ত দুর্বল আর্থিক অবস্থায় পেয়েছি।”
তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটিকে পুনর্গঠন এবং গ্রাহকবান্ধব করতে কাজ শুরু করেছেন। “আমরা ধাপে ধাপে আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি,” বলেন তিনি।
এ কে কাওসার আরও জানান, কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে মালিকপক্ষ থেকে পেইড-আপ ক্যাপিটাল সরবরাহের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। “পেইড-আপ ক্যাপিটালের অর্থ পাওয়া গেলে স্বদেশ লাইফের আর্থিক সংকট অনেকটাই কাটবে এবং লাইফ ফান্ডসহ অন্যান্য দুর্বলতা দূর করা সম্ভব হবে,” বলেন তিনি।
একইভাবে প্রোটেকটিভ ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের লাইফ ফান্ডে কোনও টাকা জমা নেই। উল্টো ফান্ডের ৮১ লাখ টাকা মাইনাস হয়ে আছে। একইভাবে গ্রাহকদের ফেরত দেওয়ার মতো একটি টাকাও নেই যমুনা লাইফ ইনস্যুরেন্সের ফান্ডেও। গ্রাহকদের জন্য গঠিত ফান্ড থেকে ৭৩ লাখ টাকা সরানোর ফলে এই প্রতিষ্ঠানের ফান্ড এখন মাইনাস হয়ে আছে।
যমুনা ইনস্যুরেন্স কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অজিত চন্দ্র আইচ বলেন, ‘‘কোনও জীবন বিমা প্রতিষ্ঠানের লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক অবস্থায় থাকলে গ্রাহকের স্বার্থ পূর্ণাঙ্গভাবে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয় না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দাবি পরিশোধসহ সামগ্রিক কার্যক্রমে ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই গ্রাহকের আস্থা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যমুনা ইনস্যুরেন্স লাইফ ফান্ড শক্তিশালী ও বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’’
আইডিআরএ’র এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “লাইফ ফান্ড শূন্য মানে কোম্পানি কার্যত দেউলিয়া। কিন্তু লাইসেন্স বাতিল বা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার মতো ক্ষমতা আইডিআরের নেই।’’
আইডিআরএ’র প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গোল্ডেন লাইফ ইনস্যুরেন্সের লাইফ ফান্ডে ৬ কোটি টাকা থাকলেও মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া গ্রাহকের প্রায় ৪১ কোটি টাকা আটকা পড়েছে, প্রগ্রেসিভ লাইফের লাইফ ফান্ডে ৭৯ কোটি টাকা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটিতে গ্রাহকের আটকা ১৫৩ কোটি টাকা। আর সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্সুরেন্সের লাইফ ফান্ডে আছে মাত্র ৮০ কোটি টাকা। অথচ কোম্পানির কাছে গ্রাহকের পাওনা ১৯০ কোটি টাকার বেশি।
উল্লেখ্য, জীবন বিমা কোম্পানির মূল ভিত্তি বা ‘প্রাণ’ হিসেবে বিবেচিত হয় লাইফ ফান্ড। এই তহবিলই মূলত নির্ধারণ করে কোনও কোম্পানি গ্রাহকের জমাকৃত অর্থ কতটা নিরাপদ এবং ভবিষ্যতে পলিসিধারীদের দাবি পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটি কতটা সক্ষম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লাইফ ফান্ড শূন্য বা ঋণাত্মক অবস্থায় থাকা জীবন বিমা কোম্পানির সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
বিমা খাতের প্রধান নির্বাহীরাই বলছেন, লাইফ ফান্ডকে একটি জীবন বিমা কোম্পানির রক্তের সঙ্গে তুলনা করা হয়। মানুষ যেমন রক্তশূন্য অবস্থায় টিকে থাকতে পারে না, তেমনই কোনও জীবন বিমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হয়ে পড়লে সেই প্রতিষ্ঠান কার্যত অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। এতে ওই কোম্পানিতে গ্রাহকদের জমা রাখা অর্থ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে এবং দাবি পরিশোধ নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
পাঁচ কোম্পানিতেই আটকা সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা : বিমা আইন অনুযায়ী, পলিসি ম্যাচিউর হওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যেই দাবি নিষ্পত্তি করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে এই আইন কাগজেই সীমাবদ্ধ।
আইডিআরএ’র তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে জীবন বিমা খাতে মোট দাবির পরিমাণ ৫ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে অনিষ্পন্ন দাবি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮৮০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে মাত্র পাঁচটি জীবন বিমা কোম্পানিতেই আটকে আছে ৩ হাজার ৪২৬ কোটি টাকার বেশি, যা মোট অনিষ্পন্ন দাবির প্রায় ৮৮ শতাংশ।
আইডিআরএ’র সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনিষ্পন্ন দাবিতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স। কোম্পানিটির মোট দাবি ২ হাজার ৮১৫ কোটি ১ লাখ টাকা হলেও এর মধ্যে ২ হাজার ৭৮০ কোটি ৫ লাখ টাকা এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে কোম্পানিটির দাবি নিষ্পত্তির হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স। প্রতিষ্ঠানটির মোট দাবি ২৫৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যার মধ্যে ২৫৫ কোটি ২৯ লাখ টাকাই অনিষ্পন্ন রয়েছে। অর্থাৎ উত্থাপিত দাবির প্রায় পুরো অংশই এখনও গ্রাহকদের হাতে পৌঁছায়নি।
তালিকার তৃতীয় অবস্থানে থাকা সানফ্লাওয়ার লাইফ ইনস্যুরেন্সের মোট দাবি ১৯৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৯০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে কোম্পানিটির দাবি নিষ্পত্তির হার মাত্র কয়েক শতাংশে সীমাবদ্ধ।
চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্স। প্রতিষ্ঠানটির মোট দাবি ১৬২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, যার মধ্যে ১৫৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা অনিষ্পন্ন। এতে কোম্পানিটির দাবি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
পঞ্চম অবস্থানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বীমা করপোরেশনের মোট দাবি ২৩৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৯৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হয়েও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের দাবি ঝুলে থাকায় এ নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি জীবন বিমা কোম্পানির সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “সত্যি বলতে বর্তমানে প্রায় কোনও কোম্পানিই নিয়ম অনুযায়ী দাবি পরিশোধ করছে না। এমনকি হাতে গোনা যে কয়েকটিকে ভালো কোম্পানি বলা হয়, তারাও ৯০ দিনের সুযোগ নিয়ে বিলম্ব করছে।” আর বেশিরভাগ কোম্পানিতে লোক ঠকানোর মহোৎসব চলছে।
বছরের পর বছর প্রিমিয়াম পরিশোধ করেও বেশিরভাগ মৃত্যু দাবি, মেয়াদপূর্তির অর্থ কিংবা সারেন্ডার ভ্যালু সময়মতো আদায় করতে পারছেন না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল তদারকি, কোম্পানিগুলোর অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির সুযোগে এই সংকট আজ গভীরে পৌঁছেছে।
একাধিক ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে একই চিত্র। দাবি পেতে কেউ বছরের পর বছর বিমা অফিসে ঘুরছেন, কেউ আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন, কেউ আবার মামলা করেছেন। অনেক ক্ষেত্রেই ‘অসম্পূর্ণ কাগজপত্র’ দেখিয়ে একাধিকবার দাবি ফেরত পাঠানো হয়েছে যেন গ্রাহককে ক্লান্ত করাই মূল উদ্দেশ্য।
‘শুধু হয়রানি, টাকা দেওয়ার সদিচ্ছা নেই’ : প্রোগ্রেসিভ লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে পলিসি করা পাবনার ভুক্তভোগী ইউসুফ আলী মিয়া জানান, তার পলিসির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২১ সালে। এই দীর্ঘদিন ধরে বিমা কোম্পানির অফিসে ঘুরেও তিনি নিজের জমানো টাকা ফেরত পাননি। তাকে কখনও বলা হয়েছে আগামী মাসে আসতে, কখনও বলা হয়েছে চেক হয়নি, আবার কখনও বলা হয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নেই।
ইউসুফ আলী মিয়ার ভাষায়, “শুধু হয়রানি। টাকা ফেরত দেওয়ার কোনও সদিচ্ছাই নেই।” নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র কাছে অভিযোগ করেও কোনও সুফল পাননি বলেও জানান। তিনি বলেন, গ্রাহককে টাকা দিতে পারছে না বলে প্রতিষ্ঠানটির পাবনা শহরের অফিস বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বাধ্য হয়ে তিনি প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে ঢাকায় হেড অফিসে ঘুরছেন। প্রায় একই অভিজ্ঞতা পাবনার খুশবু আরার পরিবারের।
শুধু তাই নয়, প্রোগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্সে পলিসি করা পাবনার ২২ জন ভুক্তভোগী আইডিআরএ’র কাছে আবেদন করেও কোনও সুফল পাচ্ছেন না।
আইডিআরএ’র সেপ্টেম্বর প্রান্তিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া গ্রাহকের ১৫৩ কোটি টাকা আটকে আছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটির লাইফ ফান্ডে আছে মাত্র ৭৯ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে প্রোগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্সের চেয়ারম্যান বজলুর রশিদ বলেন, ‘‘আমরা গ্রাহকদের টাকা দেওয়ার চেষ্টা করছি, কিন্তু আগের পর্ষদের লোকেরা লুটপাট করার কারণে আমাদের আর্থিক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।’’ আমরা এসে এটাকে ঠিকঠাক করার চেষ্টা করছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতার সুযোগে আমাদের এই প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। আমরা এখন যতটুকু পারছি গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের চেষ্টা করছি।’’
কাগজে কোম্পানি, বাস্তবে তালা : বিমা কোম্পানির অনেক শাখা অফিস কাগজে আছে, বাস্তবে নেই। কোথাও অফিস থাকলেও কর্মকর্তা নেই, কোথাও আবার তালা ঝুলছে। প্রোগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্সের পাবনা অফিস বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে পুরো জেলায় কোনও কর্মকর্তা নেই। অথচ প্রিমিয়াম আদায় থেমে নেই। এজেন্ট দিয়ে প্রিমিয়াম আদায় ঠিকই চলছে। অফিস না থাকলেও পাবনার আটঘড়িয়ায় খুঁজে পায় প্রতিষ্ঠানটির একজন এজেন্টকে। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত প্রায় দুই বছর ধরে পাবনার কেউ দাবির টাকা পাচ্ছে না। তবু যাদের দুই-তিন কিস্তি বাকি আছে, তাদের অনেকেই আগের মতোই টাকা জমা করছেন। কিন্তু সমস্যা হলো অফিসে এখন তালা ঝুলছে। তিনি বলেন, ‘‘পাবনার অফিসে তালা দেওয়ার পর থেকেই গ্রাহকরা আমার ও আমার পরিবারের ওপরে সামাজিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে হয়রানি করার চেষ্টা করছেন।’’
চেক হয়রানি : প্রোগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্সের পাবনা শাখায় পলিসি খোলা গ্রাহক রফিকুল ইসলাম বলেন, ২০২২ সালে ম্যাচিওর হওয়া থেকে গত চার বছর ধরে হেড অফিসে ঘুরেছেন। গত ডিসেম্বরে তিনি প্রতিষ্ঠানটির এমডির দফতরে পৌঁছানোর সুযোগ পান। ছয় মাস পরে টাকা ওঠাতে পারবেন এমন একটি চেক তাকে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য তার আশঙ্কা, এই চেক তাকে নতুন আরেক ভোগান্তিতে ফেলবে। কারণ, চেক ডিজঅনার এখন বিমা খাতের আরেক প্রতারণার নাম। শুধু প্রোগ্রেসিভ ইনস্যুরেন্স নয়, বেশিরভাগ কোম্পানিই এখন গ্রাহককে তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে ছয় মাস হাতে রেখে চেক দেওয়ার রীতি চালু করেছে।
অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকায় ডিজঅনার : মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরও বিমার টাকা না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সানলাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের মেহেরপুর জোনের একাধিক গ্রাহক। অভিযোগ রয়েছে, দাবি পরিশোধের নামে গ্রাহকদের চেক দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় একের পর এক চেক ডিজঅনার হয়েছে।
এ ঘটনায় প্রতারণামূলক আচরণের অভিযোগ এনে ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই সানলাইফ ইনস্যুরেন্সের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন মেহেরপুর জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম।
আইনি নোটিশে বলা হয়, মেহেরপুর জোনের আওতাধীন একাধিক গ্রাহক মেয়াদোত্তীর্ণ বিমা পলিসির দাবি পরিশোধের জন্য আবেদন করলে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ তাদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকের চেক ইস্যু করে। কিন্তু ব্যাংকে চেক উপস্থাপন করা হলে হিসাবে অর্থ না থাকায় সেগুলো ডিজঅনার হয়। এতে গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। নোটিশে এ ঘটনাকে স্পষ্ট প্রতারণা হিসেবে উল্লেখ করে একে প্রচলিত আইনে দন্ডনীয় অপরাধ বলা হয়েছে।
নোটিশে মেহেরপুরের ২২ জন গ্রাহকের পলিসি নম্বর, ব্যাংকের নাম, চেক নম্বর ও পাওনা টাকার পরিমাণ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছেও আইনি নোটিশের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে ।
এ প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘‘প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের অনেকেই এখনও পর্যন্ত পাওনা টাকা পাননি। তবে, যারা মামলা করেছে তারাই কেবল টাকা পেয়েছেন।’’
আবু ইউসুফের চোখে শুধুই হতাশা : একসময় ভালো বিমা কোম্পানি হিসেবে পরিচিত ছিল ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স। কিন্তু ২০০০ সালের পর এটি মালিকদের লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়।
সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার আবু ইউসুফ ২০০৯ সালে ১০ বছর মেয়াদি একটি পলিসি (জকিগঞ্জ শাখা থেকে) কিনেছিলেন। নিয়ম করে তিনি ৩ লাখ ৩৭ হাজার ২০০ টাকা জমা দেন। ২০১৮ সালে পলিসির সব কিস্তি পরিশোধ শেষ হলেও আজও তিনি দাবির টাকা পাননি।
ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি জানেন না—তার টাকা কোথায় আটকে আছে, কবে পাবেন, কিংবা কার কাছে গেলে সঠিক তথ্য মিলবে।
আবু ইউসুফ বলেন, “ফারইস্ট লাইফ আমার জীবন তছনছ করে দিয়েছে। এখন আমার কাছে বিমা মানেই প্রতারণা।”
আবু ইউসুফের মতো কয়েক লাখ গ্রাহক বছরের পর বছর একই অসহায় অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। রংপুরের গঙ্গাচড়ার বাসিন্দা আবু হেনা ২০১১ সালে ফারইস্ট ইসলামী লাইফে একটি জীবন বিমা পলিসি করেন। ২০১৮ সালে তার স্ত্রীর মৃত্যু হলে সব কাগজপত্র জমা দিয়েও আজ পর্যন্ত তিনি দাবি পাননি। “অফিসে গেলে বলে ফাইল প্রসেসিংয়ে আছে। সাত বছর ধরে শুধু শুনছি,” বলেন তিনি।
এমন গল্প একটি নয় হাজারো। ভুক্তভোগী গ্রাহকদের পাওনা টাকা দিতে না পারায় গত দুই-তিন বছরে প্রতিষ্ঠানটির অসংখ্য কর্মকর্তা পালিয়ে যাওয়ায় বেশ কিছু শাখা অফিস ও জোনাল অফিস বন্ধ হয়ে গেছে। গত বছরের অক্টোবরে গ্রাহকদের টাকা ফেরত না দিয়ে রাতের আঁধারে পালানোর সময় ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স রংপুর জোনাল অফিসের সামনে ট্রাক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আটক করে বিক্ষোভ করেন গ্রাহকরা। এদিকে প্রতারিত গ্রাহকরা যেন হেড অফিসে ঢুকতে না পারেন সেজন্য প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তারা পুলিশি পাহারার অফিস করছেন।
এক যুগের অপেক্ষা, টাকাই ফেরে না : এক যুগ আগে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া পলিসির টাকার অপেক্ষায় রয়েছেন অন্তত এক লাখ গ্রাহক। রংপুরের আসমা আক্তারের ফারইস্ট লাইফের একটি পলিসির মেয়াদ শেষ হয়েছে ১৬ বছর আগে। আজও তিনি একটি টাকাও ফেরত পাননি।
আইডিআরএ’র তথ্য অনুযায়ী, ফারইস্ট লাইফের কাছে ১ লাখ ৬১ হাজার গ্রাহকের ২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকার দাবি ঝুলে আছে, অথচ প্রতিষ্ঠানটির লাইফ ফান্ড পুরোপুরি শূন্য।
এক যুগের বেশি সময় গ্রাহকদের অপেক্ষা করানো কোম্পানি প্রকৃত তালিকা আইডিআরএ’র কাছে না থাকলেও এর সংখ্যা এক ডজনের বেশি। অবশ্য আইডিআরএ’র তালিকায় সবচেয়ে বিপর্যস্ত ও রুগ্ন কোম্পানির নাম ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স। কোম্পানিটিতে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকার বিমা দাবি উত্থাপিত হলেও পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ৩৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। ফলে দাবি বকেয়া রয়েছে আরও প্রায় ৯৯ শতাংশ।
আইডিআরএ’র মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, “ফারইস্ট লাইফসহ কয়েকটি কোম্পানির টাকা বাইরে চলে গেছে। তারা এখন আর দাবি পরিশোধ করতে পারবে না।”
আইডিআরএ’র তথ্য অনুযায়ী বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্সের কাছে গ্রাহকের পাওনা রয়েছে ৭৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০১৩ সালে মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে বেশ কিছু গ্রাহকের পলিসি। এই প্রতিষ্ঠানটির ৪ জন গ্রাহকের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয় যারা মেয়াদোত্তীর্ণের পর এক যুগ ধরে অর্থাৎ ১২ বছর ধরে পাওনা টাকার জন্য অপেক্ষা করছেন। এরা হলেন কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারি থানার পাগলার হাট এলাকার গ্রাহক ফরমান আলী, রংপুর পলাশবাড়ি এলাকার রাবেয়া বেগম, আবদুল বারি ও আইবেলী। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের বক্তব্য প্রায় এক, তা হলো “প্রিমিয়াম নেওয়ার সময় কোম্পানির লোকজন খুব আন্তরিক ছিলেন। কিন্তু দাবির সময় ফোনও ধরেন না।’’ তারা জানান, গত ১২ বছর ধরে তাদের কারোর পাওনাই পরিশোধ করেনি বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্স। এই তালিকায় ২০১৪ সালে ও ২০১৫ সালে ম্যাচিওর হওয়া গ্রাহকও রয়েছেন প্রায় কয়েক হাজার। কিন্তু আজ পর্যন্ত তারা পাওনা টাকা হাতে পাননি। আমাদের হাতে এসেছে শুধু বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্সেরই এমন ৫২ জনের নথি। যারা ২০০৩ ও ২০০৪ সালে এই কোম্পানিতে ১০ বছর মেয়াদি পলিসি করে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নূর মোহাম্মদ ভূইয়া বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বিভিন্ন এলাকার অফিসগুলো বন্ধ রয়েছে। যে কারণে গ্রাহকদের হয়রানি হতে হয়েছে। তবে আমরা এর প্রতিকার খুঁজছি। আশা করছি, একটু সময় লাগলেও গ্রাহকদের পাওনা মিটিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।’’
আইডিআরএ’র কর্মকর্তারা বলছেন, এই মুহূর্তে বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্সের পক্ষে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব নয়। কারণ, গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধে গঠিত প্রতিষ্ঠানটির লাইফ ফান্ডে কোনও টাকাই নেই।
বিষয়টি স্বীকার করে আইডিআরএ’র উপপরিচালক মো. সোলায়মান বলেন, “এ মুহূর্তে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে গ্রাহকের বিমা দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করা। ইতোমধ্যে কয়েকটি কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। এরপরও যারা দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হবে, প্রয়োজনে কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে হলেও গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়া হবে।”
