বিনিয়োগে ধ্বস; ১৯৮১সালের পর সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স

প্রশান্তি ডেক্স ॥ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ। সরকারও গঠন করলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাজনৈতিক পালাবদলের এই প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই ফিরে দেখা জরুরি অন্তবর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি কেমন ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অর্থনীতির কিছু সূচকে স্থিতি ফিরলেও বিনিয়োগ খাতে প্রত্যাশিত গতি আসেনি। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) টানায় প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ আরও পিছিয়ে পড়েছে। যদিও ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে সংস্কার ও বিনিয়োগের নতুন জোয়ার আসবে এমন ‘যৌক্তিক প্রত্যাশা’ তৈরি হয়েছিল।

বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নেতৃত্বে পরিবর্তন এনে অন্তবর্তী সরকার চমক দিলেও, গত ১৬ মাসে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।

অনেক ছোট, মাঝারি ও বড় কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন কমেছে, নতুন বিদেশি ইকুইটি কমেছে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে এক অঙ্কে নেমেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অন্তবর্তী সরকারের সময়ে সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচকে স্থিতি ফিরলেও প্রত্যাশিত বিনিয়োগ দেখা যায়নি। বরং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূচক মন্থরতার বার্তাই দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিনিয়োগকারীরা সাধারণত অপেক্ষা করেন, আর দেখতে থাকেন সরকার কী নীতি গ্রহণ করেন। তবে সেই সময়েই যদি দ্রুত নীতিগত সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিচারিক স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে আস্থার পুনর্গঠন ত্বরান্বিত হয়। তখন বিনিয়োগ বাড়ে। কিন্তু গত দেড় বছরে দৃশ্যমান বড় সংস্কার না হওয়ায় প্রত্যাশিত বিনিয়োগে গতি আসেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক কোর্টল্যান্ডের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. বিরূপাক্ষ পাল বলেছেন, ‘‘বিনিয়োগ বৃদ্ধিই একটি সরকারের সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রধান সূচক।’’ তার মতে, অন্তবর্তী সরকার কথার প্রতিযোগিতায় সক্রিয় থাকলেও কার্যকর নীতিনির্ধারণে ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৮১ সালের পর থেকে বিনিয়োগে এমন দুর্বল পারফরম্যান্স আর দেখা যায়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারের পক্ষ থেকে জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিকে বিনিয়োগ মন্দার কারণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘অতীতে রাজনৈতিক পরিবর্তন, বিশ্ব আর্থিক সংকট বা মহামারির সময়ও বিনিয়োগে এত বড় পতন ঘটেনি। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ব্যক্তি বিনিয়োগ কমেনি, বরং বেড়েছিল। ২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময়ও ব্যক্তি বিনিয়োগের হার ২১-২২ শতাংশের নিচে নামেনি।’’

ড. পাল আরও বলেন, ‘‘অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগও টেকসইভাবে বাড়ে না। কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্থানীয় বিনিয়োগ প্রবণতাকেই আস্থার সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন।’’ তার মতে, বর্তমান সরকারের আমলে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের আস্থা কমেছে যা বিদেশি বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’’

এক-এগারোর সময়কার অন্তবর্তী সরকার, অর্থাৎ ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন সরকারের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘‘তখনও বিনিয়োগ হার কমেনি, বরং ২১ থেকে ২২ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। সেই সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল যা বিনিয়োগে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল।’’

জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের হার কমেছে : সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ব্যক্তি বিনিয়োগ ২০১৯ সালে জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশে উন্নীত হয় যা ছিল সর্বোচ্চ। কোভিড-১৯-এর বছরেও তা বড় ধাক্কা খায়নি। কিন্তু ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত গড়ে ২৪ শতাংশে স্থির থাকা ব্যক্তি বিনিয়োগ ২০২৫ সালের জুনে নেমে আসে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে। এক বছরে প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট পতন গত চার দশকের মধ্যে নজিরবিহীন।

পরিসংখ্যান বলছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের হার ছিল ২৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে আসে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে।

একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ, নেমে এসেছে ২৮১ কোটি ডলারে। শিল্প স্থাপন বা উৎপাদন সম্প্রসারণের অন্যতম সূচক এই আমদানি হ্রাস বিনিয়োগে অনীহারই ইঙ্গিত দেয়।

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন : বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমেছে যা দুই দশকের মধ্যে অর্থাৎ ২০ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। গত ডিসেম্বর শেষে এই প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গত দুই দশকের তথ্য অনুসারে, বেসরকারি খাতে এত কম প্রবৃদ্ধি আর কখনও দেখা যায়নি। এর আগে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির রেকর্ড ছিল গত বছরের অক্টোবরে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৪-১৫ শতাংশে পৌঁছানো, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি এবং করের চাপ সব মিলিয়ে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করেছে বলে ব্যবসায়ী মহল মনে করে। এর ফলে নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাচ্ছে।

নিট এফডিআই বেড়েছে, কিন্তু নতুন ইকুইটি কম : বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ছিল ১৪২ কোটি ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬৯ কোটি ডলারে। উপরিভাগে এটি ইতিবাচক প্রবণতা।

তবে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে বিদেশি কোম্পানির পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা ও আন্তকোম্পানি ঋণ থেকে। নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ নেমে এসেছে ৫৫ কোটি ডলারে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আগের বছরের তুলনায় কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ। এমনকি করোনাকালেও নতুন ইকুইটি ছিল ৭২ কোটি ডলার।

২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে এফডিআই ৮০ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি করা হলেও, তা আগের বছরের নিম্ন ভিত্তির কারণে উচ্চ দেখাচ্ছে বলে অর্থনীতিবিদদের মত। ওই সময়ে মোট এফডিআই দাঁড়ায় ১৪১ কোটি ডলার যার মধ্যে প্রায় ৪৫ কোটি ডলার নতুন ইকুইটি। অর্থাৎ বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পুনর্বিনিয়োগই প্রধান ভূমিকা রেখেছে।

আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে : বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এখনও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ পেয়েছে ১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই। তুলনায় ভারত পেয়েছে ২৭ বিলিয়ন, ইন্দোনেশিয়া ২১ বিলিয়ন এবং ভিয়েতনাম ২০ বিলিয়ন ডলার। এমনকি পাকিস্থানও বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে।

দুই বছর আগেও এফডিআই আকর্ষণে পাকিস্থান বাংলাদেশের পেছনে ছিল। ২০২৪ সালে দেশটি বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বেশি বিনিয়োগ টেনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতির ধারাবাহিকতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারায় প্রতিযোগী দেশগুলো এগিয়ে যাচ্ছে।

বিডার নেতৃত্বে পরিবর্তন, ফল কতটা? : রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সিঙ্গাপুরে কর্মরত ব্যাংকার আশিক চৌধুরীকে দেশে এনে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বও পান তিনি।

বিনিয়োগ সম্মেলন, বিদেশ সফর ও প্রচারণায় সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিডায় নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে ৫৮ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে প্রায় ৫৬ শতাংশ। চার দিনের বিনিয়োগ সম্মেলনে ঘোষিত প্রস্তাবের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা- যা প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিডা বলছে, অতীতে অকার্যকর নিবন্ধনের প্রবণতা ছিল। এখন বাস্তবসম্মত যাচাইয়ের ফলে নিবন্ধন কমেছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, নিবন্ধন কমা, ঋণপ্রবাহ হ্রাস, যন্ত্রপাতি আমদানি কমাুসব মিলিয়ে সামগ্রিক বিনিয়োগ মন্থরতার চিত্রই ফুটে ওঠে।

ব্যবসার পরিবেশ: কাঠামোগত জট কাটেনি : ব্যবসায়ীরা বলছেন, অন্তবর্তী সময়ে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার দৃশ্যমান হয়নি। প্রধান বাধাগুলো ছিল উচ্চ সুদহার, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, অগ্রিম ও উৎসে করের চাপ, বন্দর ব্যবস্থাপনায় সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জটিলতা।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরাও রাজস্বনীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা ও নীতি ধারাবাহিকতার অভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। ব্যবসা পরিবেশ সূচক (বিবিএক্স) অনুযায়ী, গত এক বছরে আইন-কানুনের তথ্যপ্রাপ্তি, অবকাঠামো, শ্রম নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য সহজীকরণ, প্রযুক্তি গ্রহণ ও পরিবেশগত মানুএই ছয় সূচকে অবনতি হয়েছে।

ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রূপালী হক চৌধুরীর মতে, রাজস্বনীতি বিনিয়োগবান্ধব নয়, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বেশি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের দ্বিধায় ফেলছে।

অপরদিকে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘‘সাহসী কাঠামোগত সংস্কার না হলে বিনিয়োগ পরিবেশে বড় পরিবর্তন আসবে না।’’

গ্যাস সংকট, বন্দর ব্যবস্থাপনায় জট, উচ্চ অগ্রিম আয়কর, উৎসে কর এবং ব্যাংকঋণের ব্যয় সব মিলিয়ে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়েছে। ফলে নতুন বিনিয়োগের বদলে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

সরকারের ব্যাখ্যা বনাম বাস্তবতা : বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী দাবি করেছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার পরও বিনিয়োগ একেবারে শূন্যে নামেনি, বরং কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে। তার ভাষায়, এটি একটি ‘মিরাকল’।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, নিট এফডিআই বৃদ্ধি বিভ্রান্তিকর চিত্র তৈরি করছে। নতুন বিনিয়োগ না বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রফতানি সক্ষমতা বাড়বে না।

৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি: প্রেক্ষাপট কী বলছে : আশিক চৌধুরী দাবি করেন, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে বিদেশি বিনিয়োগ ৮০ শতাংশ বেড়েছে। সংখ্যাটি সঠিক হলেও প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪ সালে এফডিআই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে দাঁড়ায় ৭৮ কোটি ডলারে। সেখান থেকে ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে তা বেড়ে ১৪১ কোটি ডলারে পৌঁছালে প্রবৃদ্ধি হার ৮০ শতাংশ দেখায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ১৪১ কোটি ডলার কি ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় সন্তোষজনক?

তথ্য বলছে, করোনাকালীন ২০২০ সালের প্রথম ৯ মাসেও এফডিআইয়ের পরিমাণ এর চেয়ে বেশি ছিল। অর্থাৎ ভয়াবহ বৈশ্বিক স্থবিরতার সময়ের চেয়েও কম বিনিয়োগ পাওয়া গেলে প্রবৃদ্ধির হার উচ্চ হলেও বাস্তব অর্জন সীমিতই থাকে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিনিয়োগের গঠন। ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে আগত ১৪১ কোটি ডলারের মধ্যে প্রায় ৪৫ কোটি ডলার নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ। বাকি অংশ আন্তকোম্পানি ঋণ ও মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ। অর্থাৎ বিদ্যমান বিদেশি কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ পুনর্বিনিয়োগই প্রধান চালিকা শক্তি, সম্পূর্ণ নতুন বিনিয়োগকারীর আগমন সীমিত।

নিবন্ধন কমেছে কেন: ‘ভুয়া’ নাকি বাস্তব সংকেত? : বিনিয়োগ নিবন্ধন কমে যাওয়ার বিষয়ে আশিক চৌধুরীর বক্তব্য, আগের সরকারের সময় ‘উন্নয়নের জোয়ার’ দেখাতে অতিরিক্ত ও অকার্যকর নিবন্ধন হতো, এখন তা বন্ধ করায় নিবন্ধন কমেছে।

তবে বিনিয়োগ নিবন্ধন দীর্ঘদিন ধরেই বিনিয়োগ প্রবণতার একটি প্রাথমিক সূচক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এও এই তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নিবন্ধন কমার পাশাপাশি যদি দেখা যায়, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৭ শতাংশের নিচে, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ১৯ শতাংশ কমেছে।

জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগের হার কমেছে, তাহলে সামগ্রিক বিনিয়োগ প্রবণতায় মন্থরতার ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেবল নিবন্ধন নয়, ঋণপ্রবাহ, যন্ত্রপাতি আমদানি, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন সক্ষমতা সব সূচক একত্রে বিচার করলেই প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে।

বিতর্ক: সময়সীমা ও পরিসংখ্যান : অন্তবর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের কার্যক্রম আগস্ট-অক্টোবর থেকে শুরু হওয়ায় পুরো অর্থবছরের তথ্য দিয়ে মূল্যায়ন করলে ‘ফ্রেমিং ইফেক্ট’ তৈরি হয়। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, জিডিপি, মূল্যস্ফীতি, রফতানি ও এফডিআই সব সূচকই অর্থবছরভিত্তিক বিশ্লেষণ করা হয়, ধারাবাহিকতা ও তুলনাযোগ্যতার জন্য এটি স্বীকৃত পদ্ধতি।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ? : নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে এই কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলায় কতটুকু প্রস্তুত। তাদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে আনা, করব্যবস্থায় সরলতা ও স্থিতিশীলতা, বন্দর ও লজিস্টিক দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রশাসনিক সেবার পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন, আইনশৃঙ্খলা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয় এটি কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও রফতানির ভিত্তি। অন্তবর্তী সরকারের সময়ে নিট এফডিআই কিছুটা বাড়লেও নতুন বিনিয়োগের গতি সীমিত ছিল। ফলে সামগ্রিক শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে প্রত্যাশিত চাঙ্গাভাব আসেনি।

রাজনৈতিক স্থিতি ফিরে আসার পর এখন প্রশ্ন, নতুন সরকার কি কাঠামোগত সংস্কারে সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published.