বিশ্ব কিডনি দিবসে প্রতিপাদ্য হউক বাড়ছে কিডনি রোগ, চিকিৎসার খরচ আকাশ ছোঁয়া

প্রশান্তি ডেক্স ॥ বিশ্বজুড়ে কিডনি রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বর্তমানে প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ কোনও না কোনও ধরনের কিডনি রোগে আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিডনি রোগ এখন বিশ্বের অন্যতম বড় নীরব ঘাতক। ‘গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজ স্টাডি’ অনুসারে, প্রতি বছর প্রায় ১৪-১৫ লাখ মানুষ কিডনি রোগে মারা যায়।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যথাসময়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও চিকিৎসা না নিলে ভবিষ্যতে কিডনি রোগের বোঝা আরও বাড়বে। গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে কিডনি রোগ বিশ্বে মৃত্যুর পঞ্চম প্রধান কারণ হয়ে উঠতে পারে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন কিডনি রোগের প্রধান ঝুঁকি। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

এমন প্রেক্ষাপটে গত বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) পালিত হচ্চে বিশ্ব কিডনি দিবস। প্রতিবছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার কিডনি দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশেও অন্যান্য বছরের মতো দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য “সকলের জন্য কিডনি স্বাস্থ্য – মানুষের যত্ন নেওয়া, গ্রহকে রক্ষা করা”।

বিশ্ব কিডনি দিবস উপলক্ষে আজ বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) রোগের ঝুঁকি ও প্রতিকার সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশেষ ব্যালি আয়োজন করেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশেও কিডনি রোগের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক। দেশের প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনও না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতি বছর প্রায় ৮০ হাজার রোগীর ডায়ালাইসিস প্রয়োজন।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের কিডনি বিশেষজ্ঞ ডা. মীর রাশেদুল হাসান জানান, বাংলাদেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিবছর নতুন রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩০-৪০ হাজার। প্রধান কারণগুলো হলো ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং কিছু কিডনি সংক্রান্ত রোগ যেমন গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস।

তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ব্যথার ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার, পরিবেশ দূষণ এবং কিছু মাল্টি-সিস্টেম রোগও কিডনির ক্ষতি করতে পারে। রোগীরা প্রাথমিক পর্যায়ে সচেতন হয় না, তাই প্রায় ৭৫ শতাংশ আক্রান্ত হওয়া পর্যন্ত উপসর্গ বোঝা যায় না। সাধারণ লক্ষণ হলো প্রস্রাব কমে যাওয়া, বমি ভাব, শরীর ফুলে যাওয়া, নতুন উচ্চ রক্তচাপ, দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, রক্তশূন্যতা এবং চুলকানি।

কিডনি রোগ প্রতিরোধের পরামর্শ : স্বাস্থ্যকর জীবনধারা বজায় রাখা; ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা; অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও জাঙ্ক ফুড পরিহার করা; ধূমপান না করা; নিয়মিত রুটিন চেকআপ। যেসব রোগীর ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাদের অন্তত ৩-৬ মাস অন্তর কিডনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে (গ্রেড ফাইভ) আক্রান্ত রোগীদের জন্য রেনাল রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি অপরিহার্য। এতে ডায়ালাইসিস এবং কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট অন্তর্ভুক্ত। সরকারি হাসপাতালে প্রতি সেশন খরচ ৬১০ টাকা, তবে সিডিউল সীমিত। প্রাইভেট হাসপাতালে প্রতি সেশন ৩,৫০০ টাকা, যা অনেক রোগীর জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করে।

সরকারি হাসপাতালগুলোতে নতুন উদ্যোগ অনুযায়ী, প্রাইভেট হাসপাতালে ডায়ালাইসিস নিলেও রোগী ৬০০ টাকা দিয়ে সুবিধা পাবেন, বাকিটা ভর্তুকি হিসাবে সরকার বহন করবে।

সরকারি কিডনি হাসপাতালে রোগীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মারজিয়া আক্তারের ২৪ বছর বয়সি ছেলে রিয়াদ ২০২২ সাল থেকে কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসায় এ পর্যন্ত পাঁচ-ছয় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। খরচ বহন করতে না পেরে এক সময় চিকিৎসা বন্ধ করতে হয়েছে। দুই মাস আগে অবস্থার অবনতি হওয়ায় পুনরায় চিকিৎসা শুরু করেছেন। বর্তমানে তাকে সপ্তাহে দুইবার ডায়ালাইসিস করাতে হচ্ছে। বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিডনি রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরি করা জরুরি। এর জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনধারা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ভেজাল খাবার এড়ানো এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অপরিহার্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published.