আবারও বাজারে ছাড়া হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত নোট

প্রশান্তি ডেক্স ॥ বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে সিলগালা করে রাখা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত টাকার নোট আবারও বাজারে ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নতুন ডিজাইনের নোট ছাপাতে ধীরগতি এবং বাজারে নগদের চাহিদা বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরোনো ছাপা নোটগুলো ধাপে ধাপে প্রচলনে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ীই এসব নোট পুনরায় বিতরণ করা হচ্ছে। অপরদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য যেহেতু শেখ মুজিবের ছবিযুক্ত নোট কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি, তাই সেগুলো বাজারে ছাড়তে আইনি বা নীতিগত কোনও বাধা নেই।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নোট বিতর্ক : গত বছরের (২০২৫) রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। এর পরপরই শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তবর্তী সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতীক ও প্রতীকী উপস্থাপনার বিষয়ে কিছু পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়।

এই প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত টাকার নোট বাজারে না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তবর্তী সরকার। একইসঙ্গে নতুন নকশার নোট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় বিভিন্ন ব্যাংকের ভল্টে থাকা শেখ মুজিবের ছবিযুক্ত নতুন ছাপানো নোট সিলগালা করে রাখা হয়।

তখন থেকেই অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের একটি অংশ এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাদের মতে, ইতোমধ্যে ছাপানো নোট বাজারে না ছাড়লে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় হবে।

নতুন সরকারের নীতিগত পরিবর্তন : সাম্প্রতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি নতুনভাবে পর্যালোচনা করা হয়। সরকার মনে করছে, ইতোমধ্যে ছাপানো নোট দীর্ঘদিন ভল্টে আটকে রাখলে অর্থনৈতিকভাবে তা অযৌক্তিক হবে। এই বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংককে পুরোনো ডিজাইনের নোট পুনরায় বাজারে ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “নতুন ডিজাইনের নয় ধরনের নোট ছাপানোর কাজ চলছে। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহের গতি কিছুটা কম। যেহেতু পুরোনো নোট নিষিদ্ধ করা হয়নি এবং বাজারে নগদের চাহিদা রয়েছে, তাই আগের ছাপানো নোটগুলো ধাপে ধাপে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।

ব্যাংকগুলোতে শুরু হয়েছে বিতরণ : বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর তারা পুরোনো নোট বিনিময় ও বিতরণ শুরু করেছেন।

সোনালী ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, “২০২৫ সালের ঈদুল আজহার সময় পুরোনো ছাপা নোট বিতরণ বন্ধ ছিল। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নির্দেশনা আসে এগুলো স্বাভাবিকভাবে বিতরণ করার জন্য। এরপর থেকেই আমরা নিয়ম অনুযায়ী নোটগুলো চলমান রেখেছি।”

ব্যাংকারদের মতে, দেশে নগদ টাকার চাহিদা সব সময়ই বেশি থাকে, বিশেষ করে উৎসবের সময়। নতুন নোট ছাপানোর প্রক্রিয়া তুলনামূলক ধীর হওয়ায় বাজারে নগদের সরবরাহ ঠিক রাখতে পুরোনো নোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত।

ঈদে নতুন নোট না দিলেও বাজারে চাহিদা : এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষণা দিয়েছে, এবার ঈদ উপলক্ষে নতুন নোট বিনিময় কার্যক্রম চালু করা হবে না। তবে বাস্তবে খোলাবাজারে নতুন নোটের চাহিদা কমেনি। বিভিন্ন স্থানে বেশি দামে নতুন নোট বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে।

বিশেষ করে শেখ মুজিবের ছবিযুক্ত নোট অনেক ক্ষেত্রে ‘নতুন নোট’ হিসেবেই বিক্রি হচ্ছে। এতে বাজারে এক ধরনের অদৃশ্য লেনদেন তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা।

নতুন নোট ছাপানো নিয়ে প্রশ্ন : অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, নতুন ডিজাইনের নোট ছাপানোর প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর হওয়ায় বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে আগের নোট সিলগালা করে রাখার সিদ্ধান্তও অর্থনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।

তাদের মতে, একটি দেশের মুদ্রা কেবল অর্থনৈতিক মাধ্যম নয়, রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতারও প্রতীক। তাই মুদ্রা নকশা নিয়ে হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তন করলে তা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরোনো নোট পুনরায় বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্তকে বাস্তবতার স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছেন অনেক ব্যাংকার।

সামনে কী? : বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন ডিজাইনের নোট ছাপানোর কাজ অব্যাহত রয়েছে। ধীরে ধীরে সেগুলো বাজারে বাড়ানো হবে। তবে ততদিন পর্যন্ত বাজারের চাহিদা মেটাতে আগের ছাপানো নোটগুলোই প্রধান ভরসা হয়ে থাকবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ভবিষ্যতে মুদ্রা নকশা বা প্রতীক পরিবর্তনের মতো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক ব্যয়, মুদ্রা সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ব্যাংকিং খাতের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কারণ একটি সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু রাজনীতিতে নয় সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাতেও পড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.