প্রশান্তি আন্তর্জাতিক ডেক্স ॥ ইরান যুদ্ধের ভয়াবহতায় ফুরিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রযুক্তির সমরাস্ত্র। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন। এই পরিকল্পনা কার্যকর হলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইরত ইউক্রেন বড় ধরনের সামরিক সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট এ খবর জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট তিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চার সপ্তাহেরও কম সময়ের যুদ্ধে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানে ৯ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এই বিপুল পরিমাণ হামলায় আমেরিকার নিজস্ব মজুত দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। ফলে কিয়েভকে দেওয়ার কথা ছিল এমন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর মিসাইল এখন মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে পাঠানোর চিন্তা করা হচ্ছে।
পেন্টাগন যে অস্ত্রগুলো ইউক্রেন থেকে সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ন্যাটোর একটি বিশেষ কর্মসূচির আওতায় কেনা ইন্টারসেপ্টর মিসাইল। গত বছর চালু হওয়া ‘প্রায়োরিটাইজড ইউক্রেন রিকোয়ারমেন্টস লিস্ট’ উদ্যোগের মাধ্যমে বন্ধু দেশগুলো কিয়েভের জন্য আমেরিকার কাছ থেকে সরাসরি অস্ত্র কিনত। ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনের সরাসরি নিরাপত্তা সহায়তা কমিয়ে দিলেও এই উদ্যোগের মাধ্যমেই এত দিন অস্ত্রের সরবরাহ সচল ছিল।
ন্যাটোর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত গ্রীষ্ম থেকে ইউক্রেনের প্যাট্রিয়ট ব্যাটারির ৭৫ শতাংশ মিসাইল এবং অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রায় সব গোলাবারুদ এই কর্মসূচির মাধ্যমেই সরবরাহ করা হয়েছে। এখন সেই সরবরাহে টান পড়লে রাশিয়ার মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সামনে কিয়েভ কার্যত নিরস্ত্র হয়ে পড়বে।
ইউক্রেনের প্রধান ইউরোপীয় সমর্থকরা এখন চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটন যেভাবে গোলাবারুদ ব্যবহার করছে, তাতে ইউরোপীয় দেশগুলোর নিজস্ব ক্রয়াদেশ বিলম্বিত হতে পারে। এক ইউরোপীয় কূটনীতিক বলেন, ‘তারা যে হারে গোলাবারুদ পোড়াচ্ছে, তাতে প্রশ্ন উঠছে যে এই চুক্তির মাধ্যমে তারা আর কতদিন সরবরাহ বজায় রাখতে পারবে।’
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তির মাধ্যমে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার যে উচ্চাকাঙ্খা দেখাচ্ছেন, তার মধ্যে ওই উদ্যোগ ছিল ন্যাটোর জন্য কিয়েভকে সুরক্ষিত রাখার একটি বিকল্প পথ। ইউরোপীয়রা বিল পরিশোধ করত আর আমেরিকা অস্ত্র দিত, এতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিজয়ও নিশ্চিত হত। কিন্তু ইরান যুদ্ধ সেই সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়েছে।
পেন্টাগন ইতোমধ্যে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত থেকে প্যাট্রিয়ট এবং থাড-এর মতো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো সরিয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের অধীনে নিয়ে এসেছে। উদ্দেশ্য হলো, ইরানি ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে পারস্য উপসাগরীয় মিত্র ও মার্কিন বাহিনীকে রক্ষা করা।
পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ইউক্রেনে ভবিষ্যতে যে সামরিক প্যাকেজগুলো পাঠানো হবে, তাতে আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। দ্বিতীয় এক ব্যক্তি বলেন, ‘নীতিগত বিতর্ক এখন এটাই যে, ইউক্রেনকে আর কতটুকু দেওয়া যায়? এটি এখন একটি অত্যন্ত চলমান ও জরুরি আলোচনা।’
ইরান যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের কাছে ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পূরক প্রতিরক্ষা বাজেটের আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যেই গত সোমবার পেন্টাগন কংগ্রেসকে জানিয়েছে যে, তারা ওই কর্মসূচির আওতায় ন্যাটো দেশগুলোর দেওয়া প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার ইউক্রেনে না পাঠিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিজস্ব মজুত গড়তে ব্যবহার করতে চায়।
ইউক্রেনের মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওলগা স্টিফেনিশিনা এক বিবৃতিতে বলেছেন, কিয়েভ তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা চাহিদার বিষয়ে অংশীদারদের অবহিত করছে। তবে যুদ্ধের এই ‘চরম অনিশ্চয়তার সময়’ সম্পর্কেও তারা সচেতন।
পেন্টাগনের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, প্রতিরক্ষা বিভাগ মার্কিন বাহিনী এবং আমাদের মিত্র ও অংশীদারদের জয়ী হওয়ার জন্য যা প্রয়োজন তা নিশ্চিত করবে। তবে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।