ওয়ান-ইলেভেনের তিন কুশীলব মুখোমুখি, জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসছে নতুন তথ্য

প্রশান্তি ডেক্স ॥ সেনা সমর্থিত ‘ওয়ান-ইলেভেন’ বা ‘১/১১ সরকার’-এর অন্যতম তিন কুশীলব এখন গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে। আদালতের অনুমতিতে দ্বিতীয় দফায় হেফাজতে নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে তাদের মুখোমুখি বসিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন পর্বে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিকসহ বহু ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে অর্থ আদায়, গুম ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে এই সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। জিজ্ঞাসাবাদের অংশ হিসেবে তাদের বিভিন্ন ‘প্লেস অব অকারেন্স’ বা নির্যাতনকেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত স্থানগুলোতেও নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দারা।

ওই সময় নির্যাতনের শিকার হয়ে চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়তে বাধ্য হন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘদিন ভয় ও অনিশ্চয়তার কারণে কেউ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না করলেও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) আফজাল নাছের গ্রেফতারের পর ভুক্তভোগীরা এখন গোয়েন্দা পুলিশের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছে, আইনগত ব্যবস্থা নিতে হলে লিখিত অভিযোগ ও মামলা দায়ের করা প্রয়োজন। জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ওয়ান-ইলেভেন ও পরবর্তী সময়ে নির্যাতনের শিকার কয়েকজন ব্যক্তি ইতোমধ্যে ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগ জানিয়েছেন। তাদের আনুষ্ঠানিক মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দুই-একদিনের মধ্যেই তাদের বিরুদ্ধে নতুন মামলা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুরো অভিযানের সমন্বয়কারী বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। সে সময় তিনি ‘গুরুতর অপরাধ দমন অভিযান সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন এবং প্রায়ই দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) যাতায়াত করতেন।

দুদক সূত্র বলছে, তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ এই কুশীলবদের নেতৃত্বে থাকলেও প্রকাশ্যে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন খুবই তৎপর।

দুদকের মামলায় কাউকে রিমান্ডে নেওয়া সম্ভব না হলে পুলিশের দায়ের করা অন্য মামলায় হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে ওয়ান ইলেভেনের এই কুশীলবদের বিরুদ্ধে। জরুরি অবস্থা চলাকালে সেনা কর্মকর্তাদের নির্দেশ অমান্য করার সুযোগ ছিল না বলেও জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা।

এদিকে, মালয়েশিয়ায় জনশক্তি পাঠানোর নামে অতিরিক্ত ১১৯ কোটি ৩২ লাখ ৭০ হাজার টাকা গ্রহণের অভিযোগে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে আগেই মামলা করেছে দুদক। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুদকের সহকারী পরিচালক আবুল কালাম আজাদ তাকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করলে ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত আগামী ৯ এপ্রিল শুনানির দিন ধার্য করেছেন।

ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি নিয়ে বিশেষ অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও মামুন খালেদকে মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক মামলায় গ্রেফতার দেখাতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘সেইফ হাউজ’ ও তথাকথিত নির্যাতনকেন্দ্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, বিদেশে লোক পাঠানোর নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মামুন খালেদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ সব অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক চাপের প্রেক্ষাপটে ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত হয় সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যা ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে পরিচিত। প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থাকা এই প্রশাসনের সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ নামে আলোচিত হয়।

গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, প্রথম দফার জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদসহ কয়েকজন প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করেছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে নতুন পাওয়া নামগুলো এখনই প্রকাশ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন তারা।

গত ২৩ মার্চ রাতে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেফতারের পর ২৫ মার্চ রাজধানীর মিরপুর থেকে গ্রেফতার করা হয় ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদকে। ৩০ মার্চ গ্রেফতার হন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) আফজাল নাছের।

Leave a Reply

Your email address will not be published.