প্রশান্তি ডেক্স ॥ গওহার নঈম ওয়ারার মনের দু:খ প্রকাশ এই লিখার মাধ্যমে। ১. কাতারে কাতারে শিশুরা প্রাণ না হারালে হামের বিষয়টি যে হাতের বাইরে চলে যাে” সেটা আমাদের মালিকরা টের পেতো না। তাই এই নিষ্ঠুর দেশে সবার আগে ধন্যবাদ দিতে হয় শিশুদেরকেই। তাদের হিমশীতল মৃত্যু এখন এক গরম ঢেউ তুলেছে সারা দেশে। সংবাদ মাধ্যমে এখন শুধুই হামের খবর।

২. এখনও কোনও কোনও সাবেক আন্দোলন-কর্মী যোগাযোগ রাখেন। জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালে উত্তর করেন। এঁদের একজনকে বলেছিলাম সংসদ যখন চলছে, তখন হাম নিয়ে একটা আলোচনা হওয়া উচিত। শিক্ষকতা হাতছাড়া হয়ে গেলেও আমি এখনও স্যার। সাবেক আন্দোলন-কর্মী বললেন, ‘স্যার, হামের কথা কি সংবিধানে আছে? যদি না থাকে তাহলে হবে না।’ বুঝতে পারি, সে তাঁর হতাশা থেকে রসিকতা করছে। মার্ক টয়েন বলতেন, ‘‘মানুষের মধ্যে যতক্ষণ ‘সেন্স অব হিউমার’ আছে, ততক্ষণ আশা আছে।’’ আমরাও বেদনার বালুচরে আশায় বুক বাঁধি।
৩. সালটা ১৯৮১ হবে, তখন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করি। নয়ারহাটে থাকি, অনেক রাতে ঢাকা থেকে ফিরে তিনি আমাকে এক টুকরো কাগজ দিলেন। একটা চিঠি অনুবাদ করে মাসিক গণস্বাস্থ্যে হাম সম্পর্কিত লেখার সঙ্গে বক্সে ছাপতে হবে। চিঠিটা একজন পিতার লেখা, যার কন্যা মারা গেছে হামে। সে রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি। ভোরে কৃষিকাজে আমাকে দেখে জাফর ভাই বলেছিলেন, ‘‘রাতেই পড়সো না!! ঘুম হয়নি? রুমে গিয়ে গোসল করে একটা ঘুম দাও। বিকালে অনুবাদটা দেখবো।’’ সেই চিঠি এখনও আমাকে তাড়া করে, হামকে আমি সহজভাবে নিতে পারি না।
৪. চিঠিটা লিখেছিলেন রোয়াল্ড ডাল। তখনও হামের টিকা বাজারে আসেনি। সালটা ১৯৬২, মেয়ের হামে আক্রান্ত হওয়ার বর্ণনা দিয়ে লেখা, খোলা চিঠি।
‘‘আমার বড় মেয়ে অলিভিয়ার যখন সাত বছর বয়স, তখন তার হাম হয়েছিল। রোগটা যখন তার স্বাভাবিক গতিতে চলছিল, আমার মনে আছে আমি প্রায়ই বিছানায় তাকে বই পড়ে শোনাতাম এবং এতে বিশেষ কোনও উদ্বেগ বোধ করতাম না। তারপর একদিন সকালে, যখন সে অনেকটাই সেরে উঠছিল, আমি তার বিছানায় বসে তাকে রঙিন পাইপ-ক্লিনার দিয়ে ছোট ছোট পশুপাখি বানানো শেখাচ্ছিলাম। যখন তার নিজের বানানোর পালা এলো, আমি লক্ষ্য করলাম যে, তার আঙুল আর মাথা একসঙ্গে কাজ করছে না এবং সে কিছুই করতে পারছে না। মা তুমি কি ঠিক আছো?” আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম। ক্লান্ত অলিভিয়া বললো, “আমার খুব ঘুম পাচ্ছে বাবা,” এক ঘণ্টার মধ্যে সে অচেতন হয়ে পড়লো। ১২ ঘণ্টার মধ্যে সে মারা গেল।’’
অলিভিয়ার হাম-এনসেফালাইটিস নামক এক ভয়ঙ্কয় রোগে পরিণত হয়েছিল এবং তাকে বাঁচানোর জন্য ডাক্তারদের কিছুই করার ছিল না। সেটা ছিল প্রায় ৬৪ বছর আগের কথা, কিন্তু এখনও যদি হামে আক্রান্ত কোনও শিশুর অলিভিয়ার মতো একই মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, তাহলেও তাকে সাহায্য করার জন্য ডাক্তারদের কিছুই করার থাকবে না।
৫. হাম কি শুধু বাংলাদেশেই ছড়াচ্ছে? চারদিকের প্রচার-প্রচারণায় মনে হবে অন্তরবর্তীর অবহেলায় দেশ পড়েছে হামের হামলায়। আসলে স্বল্প উন্নত দেশ থেকে নাম কাটিয়ে উন্নয়নের উচ্চ ধাপে অধিষ্ঠিত হওয়ার উচ্চাকাঙ্খী পরিকল্পনার বলি হয়েছে স্বাস্থ্য খাত। আগের সরকারের নতুন বন্দবস্ত চালু রাখার সময় অন্তরবর্তীরা কোনও ‘ব্যাক আপ’ না রেখে টিকা কর্মসূচির আগের মডেল থামিয়ে রাখাটা ঠিক হয়নি। এই অদূরদর্শিতার দায়িত্ব কাউকে না কাউকে নিতেই হবে।
বাংলাদেশের লাগোয়া ইন্ডিয়ার রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ইতোমধ্যেই হাম পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে উঠেছে। সেখানে টিকা নেওয়ার পরেও হাম ছড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাম আবারও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ— দুই জায়গাতেই বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে। নিচে বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো:
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪-২০২৫ সালে হাম সংক্রমণ গত কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের শুরুর দিকেই ডজনখানেক অঙ্গরাজ্যে প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে।
বেশিরভাগ সংক্রমণ হচ্ছে ১. টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে এবং ২. বিদেশ ভ্রমণ থেকে ভাইরাস নিয়ে আসার কারণে। যুক্তরাষ্ট্রের Centers for Disease Control and Prevention (CDC) জানিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে পুরো কমিউনিটিতে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে আগে হাম প্রায় নির্মূল হয়েছিল (২০০০ সালে “eliminated” ঘোষণা), কিন্তু এখন ভ্যাকসিন হেজিটেন্সি (টিকা নিতে অনীহা) হামের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউরোপে পরিস্থিতি: World Health Organization I European Centre for Disease Prevention and Control অনুযায়ী ২০২৩-২০২৪ সালে ইউরোপে হামের ঘটনা কয়েকগুণ বেড়েছে। কিছু দেশে হাজারের বেশি কেস রিপোর্ট হয়েছে। বেশি আক্রান্ত দেশগুলো হচ্ছে রোমানিয়া, কাজাখস্থান, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। অনেক দেশে স্কুলভিত্তিক প্রাদুর্ভাব ও দেখা গেছে।
৬. নয়া হাম কতটা ভয়ের? কতটা শংকার!! সতর্কতার পদক্ষেপ কী হতে পারে? :
আগের হাম আর এখনকার হামের মধ্যে বিস্তর ফারাক। আগে কখনোই ছয়মাস বয়া তার কমবয়সী শিশুদের হামে ছুতো না। এবার হাসপাতালে হাসপাতালে ছয় মাসের শিশু সয়লাপ। বাংলাদেশসহ বেশিরভাগ দেশে নির্দিষ্ট বয়স অনুযায়ী টিকা দেওয়া হয়। বাংলাদেশে হামের প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে এটাকে সাধারণত গজ (Measles-Rubella) টিকা বলা হয়। দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় ১৫ মাস বয়সে। এবারের রকম-সকম দেখে মনে হচ্ছে। হামের টিকা দেওয়ার নিয়মে পরিবর্তন আনতে হবে। এখনকার হামে সংক্রমণ তীব্রতর হয়েছে, শিশুদের পাশাপাশি হাম হচ্ছে বড়দেরও । তাই রোগটি নিয়ে সতর্ক করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)ও সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনও (সিডিসি)।
৭. আগে শীতের সময়ে ও বসন্তÍ শুরু হওয়ার আগে হাম, পক্সের প্রকোপ দেখা দিতো। এখন আর কোনও বাধা-ধরা সময় নেই। একদেশ থেকে আরেক দেশে হাম ছড়িয়ে পড়ছে ঋতু না মেনেই। জলবায়ু বদলের কারণে আবহাওয়ার খামখেয়ালি, তার ওপরে বাতাসে ভাসমান দূষিত কণা, বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। ভাইরাসও বারোমাসি, তার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ পেয়ে যাচ্ছে।
৮. হামের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া: হাম নিয়ে গাফলতি করার কোনও সুযোগ নেই। এই রোগ সুদূরপ্রসারী ভোগান্তির জন্ম দেয়। হামে আক্রান্ত শিশুর যেসব দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হতে পারে, সেগুলো হচ্ছে :
১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া (Immune Amnesia)
২. মারাত্মক স্নায়বিক জটিলতা (SSPE)
একটি বিরল কিন্তু অত্যন্ত ভয়াবহ দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা। এটি সাধারণত হামে আক্রান্ত হওয়ার ৭ থেকে ১১ বছর পর দেখা দেয়। এর ফলে: ক. শিশুর হাঁটাচলা বা শারীরিক দক্ষতা নষ্ট হয়ে যায়, খ. স্মৃতিশক্তি ও মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং গ. পরিশেষে এটি কোমা এবং নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়, কারণ এর কোনও কার্যকর চিকিৎসা নেই।
৩. দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি হারানো।
৪. মস্তিষ্কের ক্ষতি (Encephalitis)।
৫. দীর্ঘমেয়াদী পুষ্টিহীনতা।
হামে আক্রান্ত শিশুর শরীরে ভিটামিন ‘এ’ -এর মজুত মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং ঘনঘন ডায়রিয়া হওয়ার ফলে শিশু দীর্ঘমেয়াদী পুষ্টিহীনতায় ভুগতে পারে।
৯. লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রাথমিক লক্ষণগুলি হচ্ছে তীব্র জ্বর, চোখ লাল হয়ে ফুলে যাওয়া, চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝড়তে থাকা, কাশি না কমা, গলার স্বরে পরিবর্তন। এরপর ধীরে ধীরে সারা গায়ে লালচে র্যাশ বা ফোস্কার মতো বেরোবে। ইদানিংকালে আরও কিছু উপসর্গ দেখা দিচ্ছে যেমন- তীব্র ডায়েরিয়া হচ্ছে, মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফ্যালাইটিসের লক্ষণও দেখা দিচ্ছে।
১০. করণীয়: লক্ষণ ধরা পড়ার পরে বাড়ির অন্য সবাইকে একটু সতর্ক থাকা দরকার। ছোটদের হাম হলে তাদের আলাদা রাখতে হবে। এই রোগটি হাঁচি, কাশি থেকে ছড়াতে পারে। আবার আক্রান্তের ব্যবহার করা জিনিসপত্র থেকেও ছড়াতে পারে। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার জিনিস যেমন- চিরুনি, গামছা, সাবান, টুথ ব্রাশ এগুলো আলাদা কয়রে দিতে হবে। হামের জীবাণু বাতাসে প্রায় একঘণ্টা সক্রিয় থাকে। কাজেই হাম হলে রোগীকে আলাদা রাখাই বাঞ্ছণীয়। রোগ ধরা পড়লে প্রথমেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সাধারণ কিছু স্বাস্থ্যবিধিও মেনে চলতে হবে।
হামের কারণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে যায়। সচেতন না হলে নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিসের মতো রোগের লক্ষণও দেখা দিতে পারে।
হাম হলে শরীরে পানির পরিমাণ কমে যায়। তাই বারে বারে পানি ও তরল খাবার খাওয়া জরুরি। হামে আক্রান্ত রোগীদের ভিটামিন ‘এ’-র অভাব হতে পারে। তাই সে ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। দেশের প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন,
ঙ্ কোনও শিশুর জ্বর এবং শরীরে র্যাশ দেখা দিলে তা হাম হোক বা না হোক, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
ঙ্ শিশুর শরীরে র্যাশ দেখা দেওয়ার দিন থেকে অন্তত পাঁচ দিন অন্যদের কাছ থেকে আলাদা রাখতে হবে।
ঙ্ এ সময় আক্রান্ত শিশুর খাবার, পানীয় ও অন্যান্য স্বাভাবিক পরিচর্যা চালু রাখতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিকসহ তাকে পরপর দুই দিন দুটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বয়স অনুযায়ী সঠিক ডোজে খাওয়াতে হবে।
ঙ্ হামে আক্রান্ত শিশুর যদি কোনও বিপদচিহ্ন, যেমন- শ্বাসকষ্ট, বারবার বমি, খিঁচুনি বা নিস্তেজ হয়ে পড়া, চোখের মণি ঘোলা হয়ে আসে বা মুখের ভেতর গভীর ঘা থাকে, তাহলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে। সেখানে শিশুকে আলাদা ওয়ার্ডে বা কেবিনে রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে হবে।
ঙ্ যদি হামে আক্রান্ত কোনও শিশুর দৃষ্টি সমস্যা বা দেখতে অসুবিধা হয়, কিংবা চোখের মণি ঘোলা লাগে, তাহলে ১৪ দিনের মাথায় আরও একটা ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল (মোট ৩টি) দিতে হবে।
পরিস্থিতি দিন দিন ঘোলাটে হচ্ছে। এসব নিয়ে রাজনীতি ঘোলা করার সুযোগ না দিয়ে পার্লামেন্টের ভেতরে এবং বাইরে একটা সর্বদলীয় সমঝোতা গড়ে তুলতে হবে। দরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটা পথরেখা তৈরি। প্রকৃত অবস্থা মানুষকে জানান। দ্রত টিকার ব্যবস্থা করা। শিশুরা না বাঁচলে পঙ্গু হলে দেশে বাঁচবে কে?
লেখক: গবেষক; wahragawher@gmail.com