প্রশান্তি ডেক্স॥ তেল পাবে কি নাকি পাবে না সেই অনিশ্চয়তা নিয়ে মতিঝিলের মেঘনা পেট্রোল পাম্পের দীর্ঘ লাইনে প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছেন প্রাইভেটকার চালক রেদোয়ান আহমেদ (৩৮)। তিন দিন আগে বিজয় সরণি এলাকার ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে প্রায় চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাননি তিনি। পরে অন্য আরেক পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করে বাসায় ফিরেছেন। তাই এবারও উদ্বিগ্ন হয়ে তেলের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।

রেদোয়ান বলেন, “আমি আজকে ১৪ বছর ধরে গাড়ি চালাই। তেলের জন্য এতো কষ্ট আমাকে জীবনেও করতে হয়নি। রাত জেগে পাম্পে দাঁড়িয়েছিলাম, তবুও তেল পাইনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল নিতে হচ্ছে। সরকার বলছে, তেলের সংকট নাই। অথচ, সব পাম্পেই দীর্ঘ লাইন, সবাই তেল পায় না। জানি না কবে এই ভোগান্তির অবসান কবে হবে।”
এক পত্রিকার সম্পাদক লাইনে দাঁড়িয়ে প্রায় ৫ ঘন্টা পর তেল পেয়েছেন। এভাবে কি দেশ চলে। যদি তেলের জন্য ৫/৯ ঘন্টা ব্যায় হয় তাহলে অন্য কাজ কিভাবে করবে? ডাইভারদের মারামারি এমনকি জরুরী প্রয়োজনে কেউ তেল নিতে চাইলে সুযোগ না দেওয়া এবং সম্মানিত ব্যক্তিবর্গকে অসম্মান করা এখন রেওয়াজে পরিণত হয়ে। এইভাবে চললে দেশ কোথায় আছে এবং কোথায় যাবে তা বলতে না পারায় লজ্জ্বিত।
ঢাকা শহরের প্রথম ফিলিং স্টেশন কিউ.জি সামদানি অ্যান্ড কোং থেকে মোটরসাইকেলের জন্য তেল নিতে ন্যাশনাল হাসপাতালের পাশে দেড় ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছিলেন রিয়াজ উদ্দিন (২৭)। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করা এই যুবক এখন রাইড শেয়ার করেন। তিনি বলেন, “অনার্স শেষ করার পর অনেক চাকরি খুঁজেছি। কিন্তু, তেমন ভাল কোনও চাকরি পাইনি। শেষমেষ রাইড শেয়ার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অন্যান্য যেকোনো চাকরির তুলনায় ইনকাম ভালোই হয়। দৈনিক হাজার বারো’শ টাকা অনায়াসে থাকে। তার ওপর মনমতো চালানো যায়। কিন্তু, গত দুই সপ্তাহ ধরে তেলের যে ক্রাইসিস চলছে, তাতে তেল সংগ্রহ করতেই জীবন বের হয়ে যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় তেলের জন্য।”
রিয়াজের পাশে থাকা একজন প্রাইভেট কার চালক চেঁচিয়ে উঠে বলেন, “৬ তারিখে তেলের জন্য সারা রাত জেগে অপেক্ষা করা লাগছে। আমরা লাইন ধরি, অনেকে ভিআইপি পরিচয়ে লাইন না ধরেই তেল নিয়ে যায়। আমাদের যতো ভোগান্তি। এমন কষ্ট আর কতদিন করা লাগবে আল্লাহ ভাল জানেন।”
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশের প্রায় সকল পেট্রোল পাম্পে গত এক মাস ধরে এই চিত্র দৃশ্যমান। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের জের ধরে রাজধানীজুড়ে মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে তেলের জন্য এক দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন ধরতে হচ্ছে চালকদের। তবুও অনেকে ঠিকমতো তেল পাচ্ছে না।
সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা যায়, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের লাইন কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করছেন চালকরা। কেউ কেউ এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরেও তেল পাচ্ছেন না। এতে করে দৈনন্দিন কাজ, যথাসময়ে অফিস যাতায়াত ও জীবিকা নির্বাহে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে।
রাজধানীর মগবাজারের ‘মঈন মোটর ফিলিং স্টেশন’, রমনার ‘রমনা ফিলিং স্টেশন’, নীলক্ষেত মোড়ের ‘পথের বন্ধু ফিলিং স্টেশন’, ইসিবি চত্ত্বরের সুমাত্রা ও মিরপুর ১৪ এর ফিলিংষ্ট্রেশন এমনকি ঢাকা শহরের প্রথম পেট্রোল পাম্প কিউ.জি সামদানিসহ বিভিন্ন পাম্প ঘুরে চালকদের তেল সংগ্রহে যে ভোগান্তি তার বাস্তবতা লক্ষ্য করা যায়।
পাম্পে তেল নিতে আসাদের অভিযোগ, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তেল সংকটের ওপরে প্রভাব ফেলেছে কথাটা সত্য, কিন্তু তার চেয়ে বেশি সত্য এই সমস্যাটা গুরুতর করেছে দেশের একটি অসাধু চক্র। তারা তেল মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। এর ফলে সরকার যেমন বিপদে পড়েছে, তেমনি চক্রটি বেশি দামে তেল বিক্রি করে ফায়দা লুটেছে।
শান্তিনগর থেকে পুরান ঢাকার কিউ.জি সামদানি পেট্রোল পাম্পে আসা মোটরসাইকেল চালক আবির মাহমুদ দীর্ঘ লাইনে বসে ক্লান্তিতে চোখ বুজে আছেন। তেল সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা বাংলাদেশিরা একটু ইতর প্রকৃতির। সুযোগ পেলেই দেশটাকে গিলে খেতে চাই। যে যেভাবে পারছে লুটেপুটে খাচ্ছে। সবাই কোনও না কোনও ধান্দায় আছে। ইরান আর আমেরিকা-ইসরায়েলের যুদ্ধে হরমুজ প্রণালি বন্ধের কথা শোনার পর পরই কৃত্রিমভাবে তেল সংকট তৈরি করেছে। অথচ তখনও কিন্তু দেশে তেলের পর্যাপ্ত মজুত ছিল। হুট করে সবজায়গাতে সংকট দেখা দিলো।”
তিনি আরও বলেন, “বিগত দুই-তিন সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন খবরে দেখছি সরকার বিভিন্ন জায়গা থেকে অবৈধভাবে মজুদ করা জ্বালানি তেল উদ্ধার করছে। আমি চাই, যারা অবৈধভাবে তেল মজুত করে মানুষের ভোগান্তি তৈরি করেছে তাদের কঠোর শাস্তি হোক। তাহলে ভবিষ্যতে অন্য কেউ এমন কাজ করবে না। ওদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে অন্যরা শুধরে যাবে।”
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটের মধ্যেও সরকার স্বচ্ছতা এবং সংস্কারের পথে রয়েছে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। বিগত সরকারগুলোর রেখে যাওয়া ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতির মধ্যেও বর্তমান সরকার উত্তরণের চেষ্টা করছে। দেশে এখন ১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে তিন শতাংশে নেমে এসেছে। তবে, এসব চাপের মধ্যেও সরকার স্বচ্ছতা বজায় রেখে পরিকল্পিত পুনরুদ্ধারের পথে এগুতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি নিরাপত্তার কোনও নির্দিষ্ট মানদন্ড ছিল না। ইস্টার্ন রিফাইনারির কৌশলগত মজুত এক সময় ৩০ দিনের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সক্ষম হলেও তা এখন কমে ১৭ দিনে নেমে এসেছে। চলমান সংকট মোকাবিলায় সরকার একটি সমন্বিত জ্বালানি কৌশল নিয়েছে। এতে জীবাশ্ম জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি ও পারমাণবিক শক্তির সমন্বয়ে উৎসে বৈচিত্র্য আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি আমদানি ও বাণিজ্য অর্থায়ন স্থিতিশীল রাখতে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো বহুপাক্ষিক সংস্থা থেকে আর্থিক সহায়তা নেওয়া হয়েছে।”