নেপালে প্রাণনাশি বন্যা থেকে এক শ্রমিকের বেঁচে ফেরার ভংয়কর বর্ণনা

প্রশান্তি আন্তর্জাতিক ডেক্স ॥ নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ত্রিশূলী নদীর পানি হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্পের টানেলে ঢুকে পড়ার সেই ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন বেঁচে যাওয়া শ্রমিকেরা। গত সপ্তাহে ভয়াবহ বন্যায় দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।

হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্পের টানেলের কংক্রিটের আস্তরণ তৈরির কাজ করছিলেন পেম্বা দুনদু তামাং ও তার প্রায় ৩০ সহকর্মী। তামাং জানান, হঠাৎ প্রবল বেগে বাতাস টানেলের দিকে ধেয়ে আসে। বাতাসের ধাক্কায় প্লাইউড উড়ে যায় এবং ভারী যন্ত্রপাতিও স্থানচ্যুত হয়। এরই মধ্যে টানেলের বাইরে থাকা কয়েকটি বাড়ি পানির স্রোতে ভেসে যায়।

তামাং বলেন, ‘আমি টানেলের প্রবেশমুখের দিকে দৌড় দিই। পানি আমার পেছনে ধেয়ে আসছিল আর আমি তার সামনে দৌড়াচ্ছিলাম।’

প্রায় ২০ মিনিট ধরে জীবন বাঁচাতে দৌড়াতে হয়েছিল তাকে। তার ভাষায়, ‘আমি আতঙ্কে প্রায় অচেতন হয়ে পড়েছিলাম। ঠিকমতো চিন্তাও করতে পারছিলাম না।’

তবে প্রাণে বাঁচলেও ভয়াবহ এই বন্যায় পরিবারের ছয় সদস্যকে হারিয়েছেন তামাং। তার মা, বড় ভাই, ভাবি এবং তাদের তিন সন্তান বন্যার সময় নদীর তীরে বাড়িতে ছিলেন। তাদের কেউই বেঁচে নেই। শুধু তামাংয়ের স্ত্রী, ছেলে ও এক ভাগনে বেঁচে আছেন।

তামাং বলেন, ‘আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, যেখানে আমাদের বাড়ি থাকার কথা ছিল, সেখানে কিছুই নেই। তখনই বুঝতে পারি সব শেষ হয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘এখন জীবনকে অর্থহীন মনে হয়। বেঁচে থাকাটাই কষ্টের। কোথায় খাব, কোথায় যাব কিছুই জানি না। যারা মারা গেছে তারা এক রকম শান্তিতে আছে, কষ্টটা আমাদের মতো যারা বেঁচে আছি তাদের।’

তার সহকর্মী ইথা ঘালেও ভয়াবহ বন্যায় পরিবারের আট সদস্যকে হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে তার মা ও বড় মেয়ে রয়েছেন। তবে তার তিন ছেলে ও স্ত্রী বেঁচে গেছেন। ঘালে বলেন, ‘আমি জানি না কেন আমি বেঁচে গেলাম। হয়তো আমার ভাগ্যে তখন মৃত্যু ছিল না।’

নেপালে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৯৯ শতাংশের বেশি আসে জলবিদ্যুৎ থেকে। তামাং ও ঘালে ত্রিশূলী নদীর তীরে অবস্থিত আপার ত্রিশূলী থ্রিবি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করছিলেন।

প্রকল্পটি আগামী বছর চালু হওয়ার কথা ছিল। উজানে থাকা আরেকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের পানি পুনরায় ব্যবহার করে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল প্রকল্পটির।

সেখানে একাধিক শ্রমিক দল কাজ করছিল। তামাং জানান, বড় টানেল-লাইনিং মেশিন পরিচালনাকারী দলটিই শেষ দিকে টানেল থেকে বের হতে পেরেছিল।

তামাংয়ের অনুমান, তার সঙ্গে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিক টানেল থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। পরে তারা শানতি বাজার গ্রামের কয়েকজনের সঙ্গে আশ্রয় নেন এবং দুই দিন সেখানে অবস্থান করেন। এরপর সেনাবাহিনী গিয়ে তাদের উদ্ধার করে।

তবে তামাংয়ের আশঙ্কা, হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্পগুলো বন্ধ হয়ে গেলে তাদের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে আমরা না খেয়ে থাকবো। কখনো কখনো মনে হয়, বেঁচে না থাকাই হয়তো ভালো ছিল।’

নেপালের গত সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় চার হাজার মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে শত শত শ্রমিক থাকতে পারেন, যারা নদীর তীরবর্তী বিস্তৃত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর টানেলে কাজ করছিলেন।

তাদের উদ্ধারে টানেলগুলোতে বাতাস ঢোকানোসহ বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে। নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেট এএফপিকে বলেন, ‘আমরা টানেলগুলোতে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে মনোযোগ দিচ্ছি। আমাদের কাজ অব্যাহত রয়েছে।’ তিনি বলেন, সেনাসদস্যদের মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি রোগের বিস্তার ঠেকাতেও মোতায়েন করা হয়েছে। ঘালে জানান, টানেল থেকে বের হওয়ার সময় প্রবল বাতাসের ধাক্কায় তারা প্রায় উড়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পড়েছিলেন।

এদিকে নতুন একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিপর্যয়ের কয়েক দিন আগে হিমবাহের আশপাশে অস্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, আরও কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা থাকলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতে পারতো।

এশিয়ান মাউন্টেন একাডেমিক অ্যালায়েন্স, স্টিমসন সেন্টার এবং চীনের ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেন হ্যাজার্ডস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের বিশেষজ্ঞরা স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে দেখতে পেয়েছেন, হিমবাহের পৃষ্ঠ দ্রুত গতিতে সরে যাচ্ছিল, গলিত পানির রং বাদামি হয়ে উঠছিল এবং আশপাশের পাথুরে এলাকায় একটি ফাটল তৈরি হচ্ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো ছিল পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার সম্ভাব্য লক্ষণ। তবে যে গতিতে তুষারধস নেমে এসেছিল, তাতে প্রচলিত সতর্কবার্তা দিয়ে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকা মানুষদের সতর্ক করা সম্ভব ছিল না।

কিন্তু আরও নিচের দিকে, যেখানে বন্যার পানি পৌঁছাতে ১০ মিনিট বা তার বেশি সময় লেগেছিল, সেখানে একটি সমন্বিত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা থাকলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতে পারত।

বর্তমানে চীন, ভারত ও নেপালের বিশেষজ্ঞ ও উদ্ধারকারী দল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ধ্বংসস্তূপ সরাতে খননযন্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছে। বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে এখনও আটকে থাকা শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।

তামাং বলেন, ‘সম্ভবত এখনও ভেতরে কিছু মানুষ বেঁচে আছেন। তাদের দ্রুত উদ্ধার করা গেলে আমি খুব খুশি হবো। আমি এমন অনেক মানুষকে চিনি, যারা এখনও সেখানে আটকে আছেন।’

সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published.