প্রশান্তি ডেক্স ॥ দেশের তৈরি পোশাক শিল্প নতুন করে গভীর অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। সুতা উৎপাদনকারী দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোকে রক্ষায় সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব মিল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে গার্মেন্টস শিল্পে তীব্র সুতা সংকট সৃষ্টি হবে এবং শেষ পর্যন্ত পুরো খাত বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

উল্লেখ্য, দেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি। কিন্তু সুতা নিয়ন্ত্রণ, বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় এ সব সংকট একসঙ্গে প্রতিফলিত হলে রফতানি, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা সরকারের কাছে সময়োপযোগী, সমন্বিত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) রাজধানীর কাওরান বাজারে বিটিএমএ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “দেশের বস্ত্র খাত জাতীয় সংকটের মুখোমুখি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আমরা ‘স্টেট অব ইমার্জেন্সি’-তে রয়েছি। প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা না পেলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আমরা কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হবো।”
তিনি আরও বলেন, ‘‘দেশের স্পিনিং মিলগুলো করপোরেট কর, টার্নওভার কর ও ভ্যাটের চাপ বহন করছে, অথচ সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বজায় থাকায় দেশীয় উৎপাদনকে ব্যর্থ করা হচ্ছে।’’
“এই ভুল নীতি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং ব্যাংক খাতের ক্ষতি করবে, যার জবাবদিহি হওয়া উচিত,” যোগ করেন শওকত আজিজ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই দ্রুত কার্যকর সমাধান না নেওয়া হলে শুধু স্পিনিং মিল নয়, পুরো তৈরি পোশাক শিল্প ও জাতীয় অর্থনীতিই বিপন্ন হয়ে যাবে।
বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামিম এহসান এই দাবিকে যৌক্তিক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখতে এখনই কার্যকর প্রণোদনা দেওয়া জরুরি। সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে এবং তিনটি অ্যাসোসিয়েশন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ— একসঙ্গে বসে সমন্বিত সমাধান বের করতে হবে। তবে মূল দায়িত্ব সরকারেরই।”
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল সতর্ক করে বলেন, ‘‘দ্রুত কার্যকর সমাধান না এলে নেতিবাচক প্রভাব শুধু শিল্প খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং তা সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা হিসেবে প্রতিফলিত হবে।’’
সুতা আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ ও বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের প্রভাব : দেশের তৈরি পোশাক শিল্প যখন বৈশ্বিক মন্দা, ক্রয়াদেশ হ্রাস, উচ্চ সুদের হার ও জ্বালানি সংকটের বহুমুখী চাপের মধ্যে টিকে থাকার লড়াই করছে, ঠিক সেই সময়ে ১০-৩০ কাউন্ট সুতার আমদানির বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহারকে পোশাক শিল্পের শীর্ষ সংগঠনগুলো বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ ‘চরম আত্মঘাতী সিদ্ধাস্ত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রফতানি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এতে রফতানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন হবে।
বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, “বিশ্ববাজারের মন্দাভাব, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট এই তিনটি চাপ একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে শিল্প এখন নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ঠিক এই সময়ে বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহার করা হবে, যা তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।”
বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম যোগ করেন, “সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ হলে তা রফতানির ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আমরা দেশীয় স্পিনিং মিল রক্ষার পক্ষে, তবে বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহার করলে তৈরি পোশাক শিল্প বড় সংকটে পড়বে। গত ছয় মাস ধরেই রফতানি নিম্নমুখী।”
সরকারের ভূমিকা ও নীতিগত সিদ্ধান্তের গুরুত্ব : বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “দেশের স্পিনিং মিলগুলো করপোরেট কর, টার্নওভার কর ও ভ্যাটের চাপ বহন করছে। অন্যদিকে সুতা আমদানিতে বন্ডুসুবিধা বজায় থাকলে দেশীয় উৎপাদনের প্রয়োজন নেই। এটি সম্পূর্ণ উল্টো শিল্পনীতি। ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও ব্যাংক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে দায়ীদের জবাবদিহি হওয়া উচিত।”
মহিউদ্দিন রুবেল আরও বলেন, ‘‘বড় ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিত প্রভাব বিশ্লেষণ জরুরি। তা না হলে ধাপে ধাপে খরচ বাড়তে বাড়তে ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।’’
রফতানি কমছে, বাজার অনিশ্চয়তা বাড়ছে : রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাংলাদেশের মোট পণ্য রফতানি কমেছে ২.১৯ শতাংশ। বিশেষ করে ডিসেম্বরে রফতানি কমেছে ১৪.২৫ শতাংশ। শীর্ষ পাঁচ খাতের তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল ও পাটজাত পণ্য সবকটির রফতানি কমেছে। মোট রফতানির প্রায় ৮৯ শতাংশ আসে এই খাত থেকে, যার মধ্যে তৈরি পোশাকের অংশ একাই ৮১ শতাংশ।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “২০২৫ সালে দেশের তৈরি পোশাক রফতানি দাঁড়িয়েছে ৩৮.৮২ বিলিয়ন ডলারে, প্রবৃদ্ধি মাত্র ০.৮৯ শতাংশ। মোট রফতানির বড় অংশই নিট পোশাক নির্ভর, যেখানে ১০-৩০ কাউন্ট কটন সুতার ব্যবহার বেশি। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সুতা আমদানির সহজলভ্যতা অপরিহার্য।”
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সম্ভাব্য বাণিজ্য যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রফতানি বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি হবে।
স্পিনিং খাত রক্ষা ও বিকল্প সমাধানের আহ্বান : বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা মনে করেন, সুতা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে স্পিনিং খাত রক্ষা করা সম্ভব নয়। দেশে উৎপাদিত সুতার ৮৫-৯০ শতাংশই রফতানিমুখী পোশাক কারখানায় ব্যবহৃত হয়। ফলে ক্রয়াদেশ কমে গেলে স্পিনিং খাতও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই থাকবে না।
সংগঠন দুটি সুতা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দিয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, যৌক্তিক সুদের হার ও সহজ ঋণপ্রবাহ, নগদ সহায়তা বা বিশেষ প্রণোদনা, উৎপাদন দক্ষতা ও প্রযুক্তি উন্নয়নে নীতি সহায়তা।
নেতারা সরকারের সঙ্গে জরুরি আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তাদের মতে, “স্পিনিং খাত রক্ষার নামে যদি তৈরি পোশাক শিল্পই ঝুঁকিতে পড়ে, তবে তা কারও জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। জাতীয় স্বার্থে সমন্বিত, বাস্তবভিত্তিক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত এখন সময়ের দাবি।”
আন্তর্জাতিক চাপ ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি : দেশের তৈরি পোশাক শিল্প এখন শুধু অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে নেই, আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন-ভারতের পাল্টা শুল্ক আরোপ এবং ইউরোপে প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের ক্রেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে ইউনিটমূল্য, রফতানি আয় এবং কর্মসংস্থান সবই প্রভাবিত হবে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২.৮৫ বিলিয়ন কেজি পোশাক রফতানি করেছে, যা ৩৯.৩২ বিলিয়ন ডলারের সমমূল্য। প্রতি কেজিতে গড় রফতানি মূল্য মাত্র ১৩.৭৮ ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধুমাত্র সস্তা কাঁচামাল নয়, উচ্চমূল্য সংযোজন, ডিজাইন, প্রযুক্তি ও ব্র্যান্ডিং অপরিহার্য।