দুই দশকে প্রথম কোন যুদ্ধবিমান ইরানে ভূপাতিত হওয়ায় প্রশ্নবিদ্ধ মার্কিন রণ কৌশল

প্রশান্তি আন্তর্জাতিক ডেক্স ॥  ইরানের আকাশে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা মার্কিন বাহিনীর জন্য এক বিরল এবং বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ২০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম যুদ্ধের ময়দানে কোনও মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলো। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দাবি করছেন যে ইরানের সামরিক শক্তি ‘পুরোপুরি বিধ্বস্ত’ হয়ে গেছে, তখন এই ঘটনা তেহরানের পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতাকেই প্রমাণ করছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্যমতেগত শুক্রবার একটি এফ১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। এতে থাকা দুজন ক্রু সদস্যের মধ্যে একজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও অন্যজনের খোঁজে এখনও তল্লাশি চলছে। এ ছাড়া ইরানের রাষ্ট্রীয় মাধ্যম দাবি করেছেতাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এ১০ অ্যাটাক এয়ারক্রাফটও বিধ্বস্ত হয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ফোর্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিউস্টন কান্টওয়েল জানানএর আগে সর্বশেষ ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় একটি এ১০ থান্ডারবোল্ট ২ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছিল। তিনি বলেনগত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্র মূলত এমন সব বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে যাদের শক্তিশালী বিমান বিধ্বংসী ব্যবস্থা ছিল না। ফলে এত দীর্ঘ সময় কোনও বিমান না হারানোটা ছিল অলৌকিক ঘটনার মতো। তিনি উল্লেখ করেনআমরা এখানে প্রতিদিন যুদ্ধের ময়দানে উড়ছি এবং তারা প্রতিদিন আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ীগত ৫ সপ্তাহে ইরান যুদ্ধে আমেরিকান বাহিনী ১৩ হাজারের বেশি মিশন পরিচালনা করেছে এবং ১২ হাজার ৩০০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। তবে রণক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র বলছেইরান এখনও একটি শক্তিশালী ও সংকল্পবদ্ধ প্রতিপক্ষ।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতেইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি বরং এটি এখনও সক্রিয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসিসএর পরিচালক বেহনাম বেন তালেবলু বলেনএকটি নিষ্ক্রিয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মানেই ধ্বংস হওয়া ব্যবস্থা নয়।

বিশেষজ্ঞদের ধারণামার্কিন বিমানগুলো নিচু দিয়ে ওড়ার কারণে সেগুলো ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া সহজ হয়েছে। মার্ক ক্যানসিয়ান নামে একজন অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল জানানবিমানটি ভূপাতিত করতে সম্ভবত কাঁধে রেখে ছোড়া কোনও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন এবং এটিই প্রমাণ করে যে ইরান দুর্বল হলেও এখনও প্রাণঘাতী।

মার্ক ক্যানসিয়ান আরও বলেনদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন বিমানের ক্ষতির হার ছিল ৩ শতাংশযা এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রায় ৩৫০টি বিমানের সমান। সেই তুলনায় এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হলেও এর একটি রাজনৈতিক দিক রয়েছে। তার মতেআমেরিকার সাধারণ মানুষ ‘রক্তপাতহীন’ যুদ্ধে অভ্যস্ত। দেশের একটি বড় অংশ এই যুদ্ধ সমর্থন করে নাতাই তাদের কাছে যেকোনও একটি ছোট ক্ষতিও অগ্রহণযোগ্য।

পাইলটদের প্রশিক্ষণে শেখানো হয় বিমান থেকে প্যারাসুট নিয়ে লাফিয়ে পড়ার পর কীভাবে নিজেদের অবস্থান উদ্ধারকারীদের জানানো যায়। তবে শত্রু পক্ষ সব সময় সেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার বা ভুল অবস্থান দেখানোর চেষ্টা করে। গত শুক্রবারের এই উদ্ধার অভিযানে মূলত হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছেযা অন্য বিমানের তুলনায় ধীরগতির হওয়ায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৮০ সালে তেহরান থেকে মার্কিন জিম্মি উদ্ধারের ব্যর্থ অভিযানেও হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে আটজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.