ছেলের মোটর সাইকেলের তেলের জন্য তপ্ত রোদে লাইনে মা

প্রশান্তি ডেক্স ॥ সকল মা-ই যদি এমন হতো। তাহলে তেলের যন্ত্রণা আরো লাঘব হতো। সরকারের মন্ত্রীরা হুংকার দিয়ে বলছে তেল মিলছে। কইরে ভাই। ২০ ঘন্টা, ১৭ ঘন্টা, ৮ঘন্টা এবং আজ সর্বশেষ ৪ঘন্টা লাইনে দাড়িয়ে মিলল ৩৫০০টাকা অকটেন। এই দশায় কি আর করা পালাক্রমেই লাইনে দাড়ানো প্রক্রিয়া এখন চলমান। কেউ রাতে আর কেউ দিনে এভাবেই মিলছে তেল। এমনি একটি হৃদয়বিদারক চিত্র এই মা।

ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি। সকাল থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে অপেক্ষায় আছেন বিথিকা রানী বৈদ্য। সকাল পেরিয়ে সূর্য মাথার ওপরে। তবে, তখনও জ্বালানি তেল নিতে পারেননি এই নারী।

এই নারীর সঙ্গে কথা হলে তিন জানান, মোটরসাইকেলটি তার ছেলে সাগরের। তার তিন সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে সাগর। মোটরসাইকেল চালিয়ে এবং কৃষিকাজ করে সংসার চালায় ওই যুবক। তেল না থাকায় ছেলে কাজে যেতে পারছেন না, তাই বাধ্য হয়ে মা নিজেই লাইনে দাঁড়িয়েছেন।

বিথিকা রানী বৈদ্য আক্ষেপ করে বলেন, “গতকালও এসে ফিরে গেছি। আজ সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। প্রখর রোদে কষ্ট হচ্ছে, তবুও তেলের আশায় বসে আছি।”

শুধু এই মা নন, তেলের জন্য দীর্ঘ সিরিয়ালে অপেক্ষা করছে মোটরসাইকেল চালকেরা। ঘটনাটি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ডেমলা ফিলিং স্টেশনের।

শ্যামনগরের ফিলিং স্টেশনগুলোতে এমন দৃশ্য এখন প্রায় নিত্যদিনের। জ্বালানি তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের চালকেরা। কেউ ভোর থেকে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, কেউবা আবার আগের রাত থেকেই অপেক্ষা করছেন।

দীর্ঘ পাঁচ দিন বন্ধ থাকার পর গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) পুনরায় তেল বিক্রি শুরু করে মুন্সিগঞ্জ ডেমলা ফিলিং স্টেশন। তেলের খবরে সেখানে ভিড় করছে চালকেরা। প্রখর তাপদাহ উপেক্ষা করে শত শত মানুষের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে মানুষেরা, যেখানে ছিলেন বিথিকা রানী বৈদ্যও।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুন্সিগঞ্জ ফিলিং স্টেশন থেকে তিনটি ইউনিয়নের মোটরসাইকেল চালকদের তেল দেওয়ার কথা ছিল। তবে, গত সপ্তাহে বুড়িগোয়ালিনি ইউনিয়নে তেল বিতরণের সময় ব্যাপক অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। ওই সময় স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির হাতে ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মারধরের শিকার হন। এই ঘটনার প্রতিবাদে ও নিরাপত্তার অভাবে গত পাঁচ দিন জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ।

মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের তথ্যমতে, এই এলাকায় দুই হাজারের অধিক ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল রয়েছে। দীর্ঘ পাঁচ দিন তেল না পাওয়ায় চালকদের জীবন-জীবিকা স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা বদলে অন্য কাজে যুক্ত হচ্ছেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনেকেই নিয়ম ভেঙ্গে তেল সংগ্রহ করছেন। এছাড়া সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত শুধুমাত্র সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল দেওয়া হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জের ইউপি সদস্য দেবাশীষ গায়েন বলেন, “অনাকাঙ্খিত কিছু ঘটনার কারণে সাময়িকভাবে তেল বিতরণ বন্ধ ছিল। ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে পুনরায় তেল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সুষ্ঠুভাবে বণ্টন নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দ্রুত কেটে যাবে বলে আমরা আশা করছি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published.