লাখো কোটি ঘাটতি নিয়ে অসম্ভব লক্ষ্য পূরণের দৌড়ে এনবিআরের হিমশিম

প্রশান্তি ডেক্স ॥ বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় গভীর চাপের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই। দেশের প্রধান রাজস্ব আদায়কারী সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যে ঘাটতির মুখে পড়েছে, তা শুধু সাময়িক নয় বরং কাঠামোগত দুর্বলতা, নীতিগত স্থবিরতা এবং অর্থনৈতিক মন্থরতার সম্মিলিত প্রতিফলন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

রেকর্ড ঘাটতির বাস্তবতা : জুলাই থেকে মার্চ এই ৯ মাসে এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের পুরো সময়ের ঘাটতি (৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা) ইতোমধ্যেই অতিক্রম করেছে এ পরিমাণ। অথচ এ সময়ে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা।

প্রবৃদ্ধি প্রায় ১১ শতাংশ হলেও লক্ষ্যমাত্রা থেকে বিশাল ব্যবধান দেখাচ্ছে যা ইঙ্গিত দেয় শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায় আয়কর খাতে ঘাটতি: প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি, ভ্যাট (মূসক): ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, আমদানি শুল্ক: ২২ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। তিনটি প্রধান খাতের কোনোটিতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়নি।

মার্চে ধস, সংকেত আরও উদ্বেগজনক : শুধু সামগ্রিক চিত্রই নয়, মাসভিত্তিক হিসাবেও উদ্বেগ বাড়ছে। মার্চ মাসে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা কম হয়েছে। প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২.৬৭ শতাংশ যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম নিম্ন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা দেশের আমদানি ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে মন্থর করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শুল্ক ও ভ্যাট আদায়ে।

যে লক্ষ্য পূরণ অসম্ভব : চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এনবিআরকে আদায় করতে হবে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ৯ মাস শেষে বাকি ৩ মাসে আদায় করতে হবে প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা প্রতি মাসে গড়ে ৭১ হাজার কোটি টাকার বেশি।

বাস্তবতা হলো, এনবিআর এখনও পর্যন্ত কোনও মাসেই ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করতে পারেনি। জানুয়ারি মাসে সর্বোচ্চ আদায় ছিল প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাকি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কার্যত অসম্ভব বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কাঠামোগত দুর্বলতা ও সংস্কার স্থবিরতা : রাজস্ব ঘাটতির পেছনে শুধু অর্থনৈতিক মন্থরতা নয়, প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতাও বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ মনে করেন, বর্তমান কাঠামোয় একই সংস্থা নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন দুটোই করছে, ফলে জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

অন্তবর্তী সরকারের সময় রাজস্ব খাত সংস্কারের জন্য যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, তা নতুন সরকার সংসদে উপস্থাপন না করায় কার্যকারিতা হারিয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের কাঙ্খিত সংস্কার আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক নয়, অর্থনীতির জন্যও একটি বড় ধাক্কা— কারণ রাজস্ব খাতের সংস্কারকে ‘অরাজনৈতিক’ প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

আইএমএফের চাপ ও অনিশ্চয়তা : আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির অন্যতম শর্ত হলো প্রতি বছর জিডিপির অন্তত ০.৫ শতাংশ সমপরিমাণ অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই শর্ত পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। রাজস্ব সংস্কার থমকে যাওয়ায় ঋণের পরবর্তী কিস্তি পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতির মন্থর গতি: মূল বাধা :- রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে আমদানি কমেছে। নতুন বিনিয়োগ স্থবির। ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি শ্লথ। এর ফলে করযোগ্য আয় ও লেনদেন কমে যাচ্ছে, যা রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সামনে যে কঠিন বাস্তবতা : নতুন সরকারের জন্য রাজস্ব খাত এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। বাজেট ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে, অথচ রাজস্ব আয় কাঙ্খিত হারে বাড়ছে না। উন্নয়ন ব্যয় বাদে সরকারের বেশিরভাগ ব্যয়ই অভ্যন্তরীণ রাজস্ব থেকে মেটাতে হয় যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

এই প্রেক্ষাপটে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এসব বিষয় এখন আর নীতিগত আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই।

উল্লেখ্য, বর্তমান রাজস্ব ঘাটতি কেবল একটি সংখ্যাগত সমস্যা নয়, এটি অর্থনীতির গভীরে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। স্বল্পমেয়াদে লক্ষ্য অর্জন যতটা কঠিন, দীর্ঘমেয়াদে সংস্কার ছাড়া এই সংকট কাটিয়ে ওঠা ততটাই অসম্ভব।

ফলে রাজস্ব খাতের সংস্কার, অর্থনৈতিক গতি পুনরুদ্ধার এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা এই তিনটি বিষয়েই এখন নির্ভর করছে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার ভবিষ্যৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.