পে-স্কেল নিয়ে ভিন্নমতের নেতিবাচক প্রভাব এখন বাজারে

প্রশান্তি ডেক্স॥ সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতিক্ষিত নতুন বেতন কাঠামো বা ‘জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫’-এর সুপারিশ আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। তবে সরকারের এই ‘কয়েক ধাপে বাস্তবায়ন’ পদ্ধতির তীব্র বিরোধিতা করছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের দাবি, কয়েক ধাপে বেতন বাড়লে বাজারে বারবার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে।

কমিশনের সুপারিশ: বেতন বাড়ছে ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ : সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশন ২০২৫-এর প্রস্তাবনায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।

সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন: বিদ্যমান সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৮। 

পেনশনভোগীদের সুবিধা: ২০ হাজার টাকার কম পেনশনধারীদের ১০০ শতাংশ, ২০-৪০ হাজারের মধ্যে থাকা ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজারের বেশি পেনশনধারীদের ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।

ভাতা বৃদ্ধি: ২০তম গ্রেডের টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা এবং বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে মাসিক ২,০০০ টাকা ভাতার সুপারিশ করা হয়েছে।

ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সরকারি পরিকল্পনা: অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশাল অংকের আর্থিক চাপ কমাতে নতুন পে-স্কেলটি দুই বা তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার।

প্রাথমিক বরাদ্দ: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আংশিক বাস্তবায়নের জন্য ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার চিন্তা করা হচ্ছে।

বাজেট চাপ: পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এই অর্থের সংস্থান হবে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনে উন্নয়ন বাজেট থেকে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে। 

চাকরিজীবী ও কর্মচারী নেতাদের প্রতিক্রিয়া: সরকারের এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ সুবিধাভোগীরা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নন-ক্যাডার কর্মচারী আকবর হোসেন বলেন, “ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের খবরে বারবার বাজারে প্রভাব পড়বে, মুল্যস্ফীতি বাড়বে, এতে সুবিধাভোগীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।”

একই সুর শোনা যায় রংপুর ডিসি অফিসের কর্মচারী মো. হেলাল উদ্দিনের কণ্ঠে। তার মতে, ধাপে ধাপে বেতন বাড়ানো হলে আমাদের কোনো লাভ হবে না। সাধারণ মানুষ মনে করবে প্রতি বছরই মনে হয় বেতন বাড়ানো হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষও মুল্যস্ফীতির কবলে পড়বে।”

বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের মহাসচিব নিজাম উদ্দিন আহমেদ জানান, কয়েক ধাপে পে-কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের নজির বিরল। অপরদিকে সচিবালয় কর্মকর্তা কর্মচারী সমিতির নেতা আব্দুল মালেক বলেন, “এক ধাপে বাস্তবায়ন করলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। আমরা সরকারের কাছে এক ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিচ্ছি।”

কমিশনের লক্ষ্য: দারিদ্র্য বিমোচন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি : জাতীয় বেতন কমিশনের সদস্য ও বিআইডিএস-এর মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, “আমরা চাই কোনও সরকারি কর্মচারী যেন দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান না করে। কেউ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করলে তার কাছ থেকে ভালো সেবা আশা করা যায় না। এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতন বেশি বাড়ানোর সুপারিশ করেছি।”

উপকারভোগীর সংখ্যা : ২০১৫ সালের পে-স্কেল অনুযায়ী বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ছাড়াও সামরিক বাহিনী, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসহ মোট প্রায় ২৪ লাখ মানুষ এই বেতন কাঠামোর আওতায় রয়েছেন। এছাড়া ৯ লাখ পেনশনভোগীও এই সুবিধার অপেক্ষায় আছেন।

অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টার সম্মতি পেলেও চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের আগে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.