বাংলাদেশের ব্যাংক খাত কি বড় বিপদের মুখে…?

প্রশান্তি ডেক্স ॥ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে। একদিকে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করছে, হাজার কোটি টাকার ক্লাবে নাম লেখাচ্ছে, ভালো লভ্যাংশ দিচ্ছে। অপরদিকে, একই সময়ে কিছু ব্যাংক ভয়াবহ লোকসান, বিপুল খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন সংকটে ডুবে যাচ্ছে। শেয়ারবাজারে একের পর এক ব্যাংক ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থাও তলানিতে পৌঁছেছে।

ব্যাংক খাতের এই বৈপরীত্য এখন শুধু আর্থিক বিশ্লেষকদের নয়, সাধারণ আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের কাছেও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনীতি যখন চাপের মধ্যে, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির, তখন কিছু ব্যাংক এত মুনাফা করছে কীভাবে? আর একই খাতের অন্য ব্যাংকগুলো কেন ধুঁকছে?

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান ব্যাংকিং খাতকে বুঝতে হলে শুধু মুনাফার অঙ্ক দেখলে হবে না; দেখতে হবে সেই মুনাফার উৎস, খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত ছাড় এবং রাজনৈতিক প্রভাবের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব।

অর্থনীতি দুর্বল, তবু ব্যাংকের রেকর্ড মুনাফা : ২০২৫ সালে দেশের বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক রেকর্ড মুনাফা করেছে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৭ শতাংশ বেশি। সিটি ব্যাংক ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা এবং পূবালী ব্যাংক ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকও ৯০০ কোটির বেশি মুনাফা অর্জন করেছে।

এছাড়া সাউথইস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়ার মতো ব্যাংকগুলোর মুনাফাতেও বড় প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। কিন্তু এই মুনাফা এসেছে মূলত তিনটি কারণে।

প্রথমত, সরকার বর্তমানে বড় বাজেট ঘাটতি মেটাতে উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে ধার নিচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে ঝুঁকিমুক্তভাবে বড় আয় করছে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনে ব্যাপক ছাড় দেওয়ায় অনেক মন্দ ঋণ কাগজে-কলমে নিয়মিত দেখানো সম্ভব হয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন রাখার চাপ কমেছে।

তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত নমনীয়তা এবং পরিদর্শনে তুলনামূলক শিথিলতার কারণে ব্যাংকগুলো তাদের আর্থিক অবস্থাকে তুলনামূলক ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছে।

ব্যাংকারদের ভাষায়, “অর্থনীতি খারাপ হলেও কাগজে আয় দেখানো সম্ভব হয়েছে।”

মুনাফার আড়ালের বাস্তবতা : ব্যাংক খাতের বর্তমান মুনাফা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেক বিশ্লেষক। তাদের মতে, এই মুনাফার বড় অংশ বাস্তব ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ বা ঋণ আদায়ের সফলতা থেকে আসেনি; বরং এসেছে হিসাব ব্যবস্থার সুবিধা, সরকারি ঋণনির্ভর আয় এবং প্রভিশন কম রাখার সুযোগ থেকে।

বিশেষ করে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কম দেখানো গেছে, সেসব ব্যাংকের মুনাফা তুলনামূলক বেশি বেড়েছে। কারণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে কম সঞ্চিতি রাখতে হওয়ায় নিট মুনাফা বেড়েছে।

অনেক ব্যাংক ট্রেজারি ব্যবসা এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকেও বড় আয় করেছে। ফলে মূল ব্যাংকিং কার্যক্রম দুর্বল হলেও কাগজে মুনাফা বেড়েছে।

ইসলামী ব্যাংক: সংকটের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ব্যাংক খাতের এই সংকটের সবচেয়ে বড় উদাহরণ এখন ইসলামী ব্যাংক পিএলসি।

দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকটি ২৮৮ কোটি টাকা লোকসান করেছে। সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে এক টাকা ৭৯ পয়সা।

ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। ২০২৫ সাল শেষে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকা, যা মোট বিনিয়োগের প্রায় ৫১ শতাংশ। দেশের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশই এখন এই এক ব্যাংকের দখলে।

অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্যাংকটির প্রয়োজনীয় প্রভিশন ছিল ৯২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে রাখা হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত ছাড় না থাকলে ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত লোকসান আরও ভয়াবহ আকারে সামনে আসতো।

ব্যাংকটির মূলধন পর্যাপ্ততার হারও নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৪২ শতাংশে, যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজন ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ।

এস আলম গ্রুপের প্রভাব :  ইসলামী ব্যাংকের সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে এস আলম গ্রুপের বিপুল ঋণ। অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ইসলামী ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা আটকে আছে। এর মধ্যে এস আলম স্টিলস, রিফাইনড সুগার, ভেজিটেবল অয়েল ও সুপার এডিবল অয়েলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণই কয়েক দশ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের ব্যবস্থাপনার সময়ে এসব ঋণের প্রকৃত ঝুঁকি গোপন রাখা হয়েছিল। নতুন ব্যবস্থাপনায় ধীরে ধীরে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের ঘটনা শুধু একটি ব্যাংকের সংকট নয়; এটি রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল সুশাসন এবং অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণের দীর্ঘমেয়াদি ফল।

শেয়ারবাজারে আস্থার সংকট : ব্যাংক খাতের এই দুর্বলতা এখন সরাসরি প্রভাব ফেলছে শেয়ারবাজারে। গত সপ্তাহে নতুন করে ১০টি ব্যাংক ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ইউসিবি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও এনআরবিসি ব্যাংক।

এর ফলে বর্তমানে জেড ক্যাটাগরিতে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫টিতে। পাশাপাশি আরও পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় থাকায় কার্যত দেশের অর্ধেকের বেশি ব্যাংকই এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

শেয়ারবাজারের নিয়ম অনুযায়ী, টানা দুই বছর লভ্যাংশ দিতে না পারলে কোনো কোম্পানিকে জেড ক্যাটাগরিতে নামানো হয়। এই ক্যাটাগরিতে গেলে মার্জিন ঋণ সুবিধা বন্ধ হয়ে যায় এবং লেনদেনে বিধিনিষেধ আরোপ হয়। ফলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যায়।

গত সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি দরপতনের তালিকায়ও আধিপত্য ছিল ব্যাংক খাতের। মার্কেন্টাইল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকসহ অনেক ব্যাংকের শেয়ারদর বড়ভাবে কমেছে। বর্তমানে তালিকাভুক্ত ১৩টি ব্যাংকের শেয়ারদর অভিহিত মূল্যের নিচে নেমে গেছে।

শক্তিশালী ব্যাংক বনাম দুর্বল ব্যাংক : সব ব্যাংক অবশ্য একই অবস্থায় নেই। ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংকের মতো কিছু ব্যাংক তুলনামূলক শক্তিশালী সুশাসন, কম খেলাপি ঋণ এবং ভালো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কারণে এখনও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

অপরদিকে, দুর্বল পরিচালনা, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণ বিতরণ এবং দুর্বল অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের কারণে কিছু ব্যাংক ক্রমেই গভীর সংকটে পড়ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন ব্যাংক খাতকে বাঁচাতে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কঠোর ব্যবস্থা; রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনা; প্রকৃত আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছ প্রকাশ; দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন ও একীভূতকরণ; দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা।

তাদের মতে, কাগজে-কলমে মুনাফা দিয়ে কিছু সময় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও বাস্তব সংকট আড়াল করে রাখা দীর্ঘমেয়াদে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.