ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালায়নি তবে কে চালাল হামলা

প্রশান্তি আন্তর্জাতিক ডেক্স ॥ যুক্তরাষ্ট্র তাদের হামলা শেষ করার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই ইরানজুড়ে নতুন করে এক সিরিজ অজ্ঞাত বিমান হামলা চালানো হয়েছে। কে বা কারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রটিকে লক্ষ্য করে এই নতুন হামলা চালাচ্ছে, তা নিয়ে আবারও বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

গত শুক্রবার পর্যন্ত এই হামলার দায় কেউ স্বীকার করেনি। গত বৃহস্পতিবার যখন ইরান তাদের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে এই বিমান হামলাগুলো চালানো হয়। ইরানের শিয়া শাসনব্যবস্থা এই হামলার জন্য সরাসরি কাউকে দায়ী করেনি। তবে দেশটির একজন সংসদ সদস্য সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হুঁশিয়ারি দিয়ে দাবি করেছেন, তারা ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানে ‘নেপথ্যে থেকে’ সহায়তা করছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের ক্রমাগত হামলার শিকার হওয়া উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এই নতুন বিমান হামলার বিষয়ে গত শুক্রবার তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি। তবে তারা এবং যুক্তরাষ্ট্র অনড় অবস্থানে রয়েছে যে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অবশ্যই সবার জন্য উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখতে হবে।

বিপরীতে ইরান দাবি করছে, এই প্রণালি এখন থেকে সম্পূর্ণ তাদের একক নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং এর মধ্য দিয়ে চলাচলকারী নৌযানগুলোকে তেহরানকে ফি প্রদান করতে হবে। অথচ কয়েক দশক ধরে বিশ্ব সম্প্রদায় এটিকে একটি আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ পথ দিয়েই পরিবাহিত হতো। চলমান সংঘাতের সময় এই প্রণালির ওপর ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছিল, যদিও তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি যুদ্ধকালীন সর্বোচ্চ ১২০ ডলার থেকে এখন অনেকটাই কমে এসেছে। অন্যদিকে এই যুদ্ধে অংশ নেওয়া ইসরায়েলও ইরানের ওপর সাম্প্রতিক কোনও হামলার দায় স্বীকার করেনি।

মার্কিন হামলা শেষ হওয়ার পর অজ্ঞাত হামলা শুরু : মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৬টায় জানায় যে তারা ইরানে প্রায় ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মধ্য দিয়ে তাদের দ্বিতীয় দফার হামলা শেষ করেছে। কিন্তু এর ঠিক পরপরই ইরানের সংবাদমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো দেশটির বুশেহর ও সিস্তান-বেলুচিস্থান প্রদেশ, আহভাজ ও চাবাহার শহরসহ অন্যান্য এলাকায় নতুন করে সিরিজ বিমান হামলা ও বিস্ফোরণের খবর দেয়। মার্কিন সামরিক অভিযানের বিশদ বিবরণ নিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানান, গত বৃহস্পতিবার সকালে শেষ হওয়া দফার পর মার্কিন বাহিনী নতুন করে কোনও হামলা চালায়নি।

গত বৃহস্পতিবারের এই হামলার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তাদের আক্রমণের পরিধি বাড়িয়ে বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত ও কাতারে একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এই চার দেশে ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতার সাইরেন বেজে উঠলে সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটেন। আঞ্চলিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই হামলা প্রতিহত করার সময় কুয়েতে একজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ইরানি হামলার পরপরই সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান তেলসমৃদ্ধ ছোট দেশ কুয়েতের আমিরের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসতে সেখানে ছুটে যান। এ ছাড়া উপসাগরীয় আরব দেশগুলো কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও ফোনালাপ করেছেন। কাতার ও পাকিস্থান যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সরাসরি যুদ্ধ ঠেকাতে এবং অন্তবর্তীকালীন চুক্তি বজায় রাখতে নিবিড়ভাবে মধ্যস্থতা করে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, এই যুদ্ধের সময় আগেও বেশ কিছু অজ্ঞাতপরিচয় বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছিল। পরবর্তীতে কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেন যে তেহরান যখন সৌদি আরব ও আমিরাতের জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হেনেছিল, তখন এর প্রতিশোধ হিসেবে এই দুই দেশও ইরানে বিমান হামলা চালিয়েছিল। ফলে, উপসাগরীয় কোনও দেশ আবারও ইরানে আঘাত হেনে থাকলে তা মূলত তেহরানকে পাল্টা হামলা থেকে বিরত রাখার একটি প্রচেষ্টা হতে পারে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অধীনে ইরানের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযান চালানো ইসরায়েল গত জুনের পর থেকে আর কোনও হামলা চালায়নি। সাধারণত ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পরপরই তা স্বীকার করে থাকে।

ইসরায়েল সরকার জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং ট্রাম্প তাকে উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার সামরিক পদক্ষেপের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানিয়েছেন। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল প্রয়োজন হলে ইরানের মুখোমুখি হতে তার দেশ প্রস্তুত বলে নতুন করে হুমকি দিয়েছেন। একটি সামরিক অনুষ্ঠানে কাৎজ বলেন, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং আকাশসীমার আধিপত্য পুনরুত্থাপন করতে এবং হুমকি দূর করতে ইরানে আবার ইসরায়েল হামলা চালাতে প্রন্তুত। যদি আমাদের ফিরতে হয়, তবে আমরা আরও তীব্র শক্তি নিয়ে ফিরবো।

ইরানের হুমকি অব্যাহত : গত শুক্রবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সদস্য ও আধাসামরিক বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডের সাবেক কমান্ডার ইসমাইল কৌসারির একটি বক্তব্য প্রকাশ করেছে। সেখানে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করার জন্য আমিরাতকে চড়া মূল্য দিতে হবে।

সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় আমিরাতের ‘নেপথ্য ভূমিকা’ ছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

যুদ্ধ চলাকালীন উপসাগরীয় আরব দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে সরাসরি সমর্থন করার বিষয়টি অস্বীকার করলেও ইরান বারবারই তাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ এনেছে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের দেশগুলোতে বড় আকারের সামরিক ঘাঁটি বজায় রেখেছে, যার মধ্যে বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতর অবস্থিত।

এদিকে হরমুজ প্রণালির একক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার বিষয়ে ইরান অনড় থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্র নৌযানগুলোকে ইরানের জলসীমা এড়াতে ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ রুট ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বহুজাতিক সংস্থা যৌথ সামুদ্রিক তথ্য কেন্দ্র (জেএমআইসি) গত শুক্রবার একটি নতুন সতর্কতা জারি করে জাহাজগুলোকে ওই রুট ব্যবহারের তাগিদ দিয়েছে। গত মঙ্গলবার জাহাজগুলোকে অনুরূপ রুট ব্যবহারের বার্তা দেওয়ার পরই ইরান ক্ষুব্ধ হয়ে হামলা চালায়, যাতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সামুদ্রিক তথ্য কেন্দ্রটি স্পষ্ট করে বলেছে, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর সাম্প্রতিক উসকানিমূলক হামলা সত্ত্বেও, নাবিকদের মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে প্রণালির দক্ষিণ রুটটি সম্প্রসারিত করা হয়েছে এবং এটি সব ধরনের যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।         সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল

Leave a Reply

Your email address will not be published.