লজ্জা নয় বুদ্ধিমত্তা: মা-বাবার ঘরে ফেরাই এখন ট্রেন্ড

প্রশান্তি আন্তর্জাতিক ডেক্স ॥ একটা সময় ছিল, যখন পড়াশোনা শেষ করে কুড়ির কোঠায় থাকা কোনও তরুণ বা তরুণী মা-বাবার বাড়িতে ফিরে আসাকে ভাবা হতো ব্যক্তিস্বাধীনতার অভাব বা একধরনের ব্যর্থতা। কিন্তু বর্তমানের আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে আমেরিকার সমাজব্যবস্থায় সেই ধারণা পুরোপুরি বদলে গেছে। ২০২৬ সালে এসে মা-বাবার সঙ্গে এক ছাদের নিচে থাকাকে এখন আর লজ্জার কিছু মনে করা হয় না; বরং একে দেখা হচ্ছে বুদ্ধিমানের মতো আর্থিক সাশ্রয় ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হিসেবে।

ফেডারেল রিজার্ভের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, গত বছর ৩০ বছরের কম বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৪৯ শতাংশই মা-বাবার সঙ্গে একই বাড়িতে বাস করছিলেন, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। আর থ্রাইভেন্ট নামের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জরিপ বলছে, মা-বাবার ঘরে ফিরে আসা এই তরুণদের ৫৫ শতাংশই এসেছেন মূলত আর্থিক বাধ্যবাধকতার কারণে। বর্তমানে আমেরিকায় একটি বাড়ির গড় দাম ৪ লাখ ডলার ছাড়িয়েছে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শহরের ভাড়া। ইউনিভার্সিটি শেষ করা অনেক তরুণের মাথায় আবার চেপে আছে হাজার হাজার ডলারের স্টুডেন্ট লোন। ২৮ বছর বয়সী মেগান ট্যালি যেমন বলেন, এখন একা থাকতে গেলে মাসের শেষে পকেটে একটা কানাকড়িও থাকবে না।

এই পরিস্থিতি মার্কিন সমাজ ও আবাসন ব্যবসাতেও পরিবর্তন আনছে। অনেক পরিবার এখন মূল বাড়ির পাশে ছোট আলাদা থাকার ঘর তৈরি করছে, যাতে সন্তানরা কয়েক বছর ভাড়া না দিয়ে টাকা জমিয়ে নিজেদের প্রথম বাড়ি কিনতে পারে। তরুণরা এখন নিজেদের ‘স্টে-অ্যাট-হোম ডটার’ বা ‘স্টে-অ্যাট-হোম সন’ পরিচয় দিয়ে টিকটকে ভিডিও বানাচ্ছেন, যা থেকে উল্টো আয়ও হচ্ছে। ২৯ বছর বয়সে ব্রেকআপের পর ম্যানহাটনের ফ্ল্যাট ছেড়ে মায়ের কাছে ফেরা সামান্থা স্তোবো এখন ৩৩ বছর বয়সেও মায়ের সঙ্গেই সানন্দে থাকছেন।

তবে বড় বয়সে মা-বাবার সঙ্গে থাকার কিছু নিজস্ব নিয়মও তৈরি হচ্ছে। যেমন ২৮ বছর বয়সী কেসি রাইট তার ঘরের টোয়াইলাইট সিনেমার পোস্টার ছিঁড়ে বড়দের মতো সাজিয়েছেন। মা-বাবার সঙ্গে তার কোনও সান্ধ্য আইন বা ‘কারফিউ’ না থাকলেও বাইরে যাওয়ার আগে জানিয়ে যান। কেসি তার বাবাকে রান্নায় ও ঘাস কাটায় সাহায্য করেন, আর মা দিনে কয়েকবার তার ঘরে আসেন প্রযুক্তির বিষয়ে সাহায্য নিতে। অন্যদিকে ৩৩ বছর বয়সী কারমেন জনসন জানান, মা-বাবার সঙ্গে থাকায় কোনও ভাড়া দিতে হয় না বলে সেই টাকা তিনি সংগীতে বিনিয়োগ করছেন। তবে প্রেমের প্রথম ডেটিংয়ে মা-বাবার সঙ্গে থাকার কথা সরাসরি বলতে কিছুটা দ্বিধা কাজ করে তার। আবার জেসিকা সুজিও নামের এক বিধবা নারীর দুই ছেলেই বাড়িতে থাকায়, নিজের নতুন বয়ফ্রেন্ডকে বাড়িতে নিয়ে আসাটা একটু অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায় সবার জন্যই।

কেসির বাবা ক্রেইগ রাইট জানান, ১৯৮০-এর দশকে তিনি যখন ৩০ বছর বয়সী তরুণ, তখন মাত্র ৭০ হাজার ডলারে তিন বেডরুমের বাড়ি কিনেছিলেন, যা এখনকার বাজারমূল্যের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। আজকের তরুণদের জন্য পরিস্থিতি যে মোটেও সহজ নয়, তা তিনি বোঝেন। তাই তরুণদের মা-বাবার সঙ্গে থাকার এই নতুন অভ্যাসকে এখন সবাই ‘স্বাভাবিক’ হিসেবেই মেনে নিচ্ছেন।

সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

Leave a Reply

Your email address will not be published.